বজ্রাঘাতে গরু মৃত্যুর একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে কাছাড় জেলার লখিপুরে। বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন, অর্থাৎ ১৫ এপ্রিল বুধবার রাত প্রায় সোয়া এগারোটার সময়, জয়পুর পুলিশ থানার অন্তর্গত হরিনগর দিপুছড়া গ্রামে এক প্রচণ্ড বজ্রপাতে একসাথে ১১টি গরু প্রাণ হারায়। ছটি দরিদ্র পরিবারের মোট বারোটি গরু একটি গাছের নীচে আশ্রয় নিয়েছিল — সেই গাছেই আছড়ে পড়ে বজ্র, মুহূর্তেই ১১টি গরু ঘটনাস্থলে মারা যায় এবং একটি গুরুতর আহত হয়। উৎসবের রাতে এই ভয়াবহ বিপর্যয়ে সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে পড়েছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো, কারণ গরুগুলোই ছিল তাদের জীবিকার প্রধান উৎস।
কারা ক্ষতিগ্রস্ত — ছয় পরিবারের বেদনার কাহিনি
হরিনগর দিপুছড়া গ্রামের যে ছয়টি পরিবার এই বজ্রাঘাতে সর্বস্ব হারিয়েছে, তাদের প্রত্যেকেই গ্রামীণ দিনমজুর বা ক্ষুদ্র কৃষক। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো হল নির্মলা বর্মন, প্রিয়ংকা বর্মন, আসালু বর্মন, বিপুলি বর্মন, প্রতিমা বর্মন ও রেবিতা বর্মনের পরিবার। এই পরিবারগুলোর কাছে গরু পালন ছিল কেবল একটি পেশা নয় — এটি ছিল তাদের দৈনন্দিন জীবনের ভিত্তি। দুধ বিক্রি, কৃষিকাজে গরুর ব্যবহার এবং প্রয়োজনে গরু বিক্রি করে সংসারের জরুরি খরচ মেটানো — এই সবকিছু মিলিয়েই গরুগুলো ছিল তাদের আর্থিক সুরক্ষাকবচ। একটি রাতেই সেই সুরক্ষা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে।
বিশেষত মর্মান্তিক হল এই যে, ঘটনাটি ঘটেছে বাংলা নববর্ষের প্রথম রাতে — যখন পরিবারগুলো নতুন বছরের আনন্দে মশগুল থাকার কথা ছিল। উৎসবের আলো নিভে গিয়ে তাদের বাড়িতে নেমে এসেছে শোক ও দুশ্চিন্তার গভীর অন্ধকার। একটি বা দুটি গরু হারানোও একটি দরিদ্র পরিবারের জন্য বড় আঘাত — সেখানে একসঙ্গে দুই বা ততোধিক গরু হারানো মানে কার্যত পথে বসে যাওয়া।
জেলা পরিষদ সদস্যের সফর ও সরকারি সাহায্যের প্রতিশ্রুতি
ঘটনার পরদিন বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) স্থানীয় জেলা পরিষদ সদস্য বিজয়েতা মাহাতো একজন পশুচিকিৎসককে নিয়ে হরিনগর দিপুছড়া গ্রামে ছুটে যান। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সাথে দেখা করেন, তাদের দুর্দশার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং সরকারি সহায়তা পাইয়ে দেওয়ার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন বলে আশ্বাস দেন। পশুচিকিৎসক মৃত গরুগুলো পরীক্ষা করে ক্ষতির একটি সরকারি নথি তৈরি করেন, যা ক্ষতিপূরণ দাবির জন্য প্রয়োজনীয়।
আসাম সরকারের বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী, বন্যপ্রাণী বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে গবাদি পশু মারা গেলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার নির্দিষ্ট ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারেন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গরু মৃত্যুতে সর্বোচ্চ ৩৭,৫০০ টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ পাওয়ার বিধান রয়েছে। তবে বাস্তবে এই প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রী ও কাগজপত্রনির্ভর হওয়ায় দরিদ্র পরিবারগুলো প্রায়ই ন্যায্য সাহায্য সময়মতো পান না। বিজয়েতা মাহাতো এই বাধাগুলো দূর করে দ্রুত সহায়তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেবেন বলে আশা করছেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো।
বজ্রপাতে গবাদি পশু মৃত্যু: আসামে একটি বারবার ঘটা বিপদ
বজ্রাঘাতে গরু মৃত্যুর এই ঘটনা লখিপুরে সম্পূর্ণ নতুন নয়। মাত্র কিছু মাস আগে, ২০২৬ সালের মার্চ মাসে, আসামের লখিমপুর জেলার ধাকুয়াখনায় একটি বজ্রপাতে ৩০টিরও বেশি ছাগলসহ মোট ৩৬টি গবাদি পশু একসাথে মারা গিয়েছিল। ২০২৩ সালে লখিপুরের বোয়ালিচড়াবাড়ি এলাকাতেও বজ্রপাতে চারটি গরু মারা যায়। উত্তর-পূর্ব ভারতে, বিশেষত বর্ষার আগে ও বর্ষার মৌসুমে এই ধরনের বজ্রপাতের ঘটনা ক্রমশ বাড়ছে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই অঞ্চলে বজ্রঝড়ের তীব্রতা ও ঘনত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে।
গ্রামীণ অঞ্চলে গবাদি পশু মালিকদের মধ্যে সচেতনতার অভাবও একটি বড় সমস্যা। অনেক কৃষকই জানেন না যে বজ্রপাতের সময় গাছের নীচে আশ্রয় নেওয়া সবচেয়ে বিপজ্জনক। খোলা মাঠে চরানো গবাদি পশুকে বজ্রপাত থেকে বাঁচাতে হলে সময়মতো বদ্ধ গোয়ালঘরে নিয়ে আসা একমাত্র উপায় — কিন্তু হঠাৎ আসা ঝড়ে সেটা সম্ভব হয় না।
হাইলাকান্দি ও বরাক উপত্যকায় বজ্রপাতের ঝুঁকি
লখিপুরের এই ঘটনা হাইলাকান্দি জেলার লালা অঞ্চলের মানুষদের কাছেও অপরিচিত নয় — কারণ বরাক উপত্যকার গ্রামীণ এলাকায় গবাদি পশু পালন এখনও বহু পরিবারের জীবিকার কেন্দ্রে রয়েছে। এপ্রিল-মে মাসে কালবৈশাখীর মৌসুমে হাইলাকান্দি, কাছাড় ও করিমগঞ্জ জুড়ে প্রায়ই শক্তিশালী বজ্রঝড় আছড়ে পড়ে। বিগত কয়েক বছরে বরাক উপত্যকায় বজ্রাঘাতে মানুষ ও গবাদি পশুর মৃত্যুর একাধিক খবর সামনে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে লালা ও হাইলাকান্দির গ্রামীণ পরিবারগুলোকে সতর্ক থাকা প্রয়োজন — বজ্রপাতের পূর্বাভাস পেলেই গবাদি পশুকে সুরক্ষিত আশ্রয়ে রাখতে হবে এবং নিজেরাও খোলা জায়গা এড়িয়ে চলতে হবে। লখিপুরের হরিনগর দিপুছড়ার ছয়টি পরিবারের এই মর্মান্তিক পরিণতি একটি সতর্কবার্তাও বটে। সরকারের উচিত ক্ষতিপূরণ প্রক্রিয়া আরও সহজ ও দ্রুত করা, এবং গ্রামীণ স্তরে বজ্রপাত-সচেতনতা প্রচারণা জোরদার করা। জেলা পরিষদ সদস্য বিজয়েতা মাহাতোর উদ্যোগ যদি সত্যিই দ্রুত ফল দেয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো হয়তো কিছুটা মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে — কিন্তু যে জীবিকা একটি রাতে মাটিতে মিশে গেছে, তা পুনরায় গড়তে লাগবে অনেক সময় ও সহযোগিতা।