পবন খেড়া সুপ্রিম কোর্ট থেকে কোনো অন্তর্বর্তী সুরক্ষা পেলেন না। আজ ১৭ এপ্রিল শীর্ষ আদালত কংগ্রেস নেতা ও দলের মিডিয়া বিভাগের চেয়ারম্যান পবন খেড়ার আবেদন নাকচ করে দিয়েছে। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার স্ত্রী রিনিকি ভূয়ান শর্মার বিরুদ্ধে কথিত মন্তব্যের জেরে দায়ের হওয়া FIR মামলায় সম্ভাব্য গ্রেফতার থেকে সুরক্ষার জন্য তিনি আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। বিচারপতি জে কে মাহেশ্বরী এবং অতুল এস চান্দুরকারের বেঞ্চ সাফ জানিয়ে দিয়েছে, এই মামলায় আগাম জামিনের আবেদন আসামের সংশ্লিষ্ট আদালতেই করতে হবে — সুপ্রিম কোর্টে নয়।
পাসপোর্ট বিতর্কের শুরু: খেড়ার অভিযোগ ও FIR দায়ের
এই আইনি লড়াইয়ের সূত্রপাত ৫ এপ্রিল। সেদিন একটি সংবাদ সম্মেলনে পবন খেড়া দাবি করেন যে আসামের মুখ্যমন্ত্রীর স্ত্রী রিনিকি ভূয়ান শর্মার কাছে তিনটি পাসপোর্ট রয়েছে — সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE), মিশর (Egypt) এবং অ্যান্টিগুয়া-বার্বুডার পাসপোর্ট। তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, ৯ এপ্রিলের আসাম বিধানসভা নির্বাচনের আগে দেওয়া নির্বাচনী হলফনামায় মুখ্যমন্ত্রী কেন এই বিদেশি সম্পত্তি ও পাসপোর্টের তথ্য প্রকাশ করেননি। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এই অভিযোগগুলো “মিথ্যা ও বানোয়াট” বলে প্রত্যাখ্যান করেন এবং কঠোর আইনি ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দেন। পরদিন ৬ এপ্রিল রিনিকি ভূয়ান শর্মা গুয়াহাটি ক্রাইম ব্রাঞ্চ থানায় FIR দায়ের করেন। FIR-এ ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ধারা ১৭৫ (নির্বাচন সংক্রান্ত মিথ্যা বক্তব্য), ধারা ৩৫ এবং ধারা ৩১৮ (প্রতারণা) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই দিনে আসাম পুলিশ দিল্লিতে খেড়ার বাসভবনে তল্লাশি চালায়।
তেলেঙ্গানা থেকে সুপ্রিম কোর্ট — জামিনের টানাটানি
FIR দায়ের হওয়ার পর পবন খেড়া আসামের আদালতে না গিয়ে তেলেঙ্গানা হাইকোর্টে আগাম জামিনের আবেদন করেন। ৯ এপ্রিল তেলেঙ্গানা হাইকোর্ট বিচারপতি কে সুজানার বেঞ্চ খেড়াকে এক সপ্তাহের ট্রানজিট আগাম জামিন দেয় এবং নির্দেশ দেয় সেই সময়ের মধ্যে উপযুক্ত আদালতে আবেদন করতে। তবে আসাম সরকার এই নির্দেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করে। সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আসাম সরকারের পক্ষে যুক্তি দেন যে তেলেঙ্গানা হাইকোর্টের কোনো আঞ্চলিক এখতিয়ার ছিল না এই মামলা শুনতে — কারণ FIR গুয়াহাটিতে নথিভুক্ত হয়েছে। ১৫ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্ট তেলেঙ্গানা হাইকোর্টের সেই নির্দেশ স্থগিত রাখে।
এরপর পবন খেড়ার আইনজীবী সিনিয়র অ্যাডভোকেট অভিষেক সিংভি সুপ্রিম কোর্টে আর্জি করেন, অন্তত ২০ এপ্রিল পর্যন্ত গ্রেফতার থেকে সুরক্ষা দেওয়া হোক — কারণ বিহু উৎসবের কারণে আসামের আদালতগুলো বন্ধ ছিল। কিন্তু আজ সুপ্রিম কোর্ট সেই আবেদনও নাকচ করে দেয়। আদালত একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশও দিয়েছে — আসামের সংশ্লিষ্ট আদালত যখন খেড়ার আবেদন শুনবে, তখন সে আদালত যেন সুপ্রিম কোর্ট বা তেলেঙ্গানা হাইকোর্টের পূর্ববর্তী কোনো পর্যবেক্ষণ দ্বারা প্রভাবিত না হয় এবং সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেয়।
আসাম বিধানসভা নির্বাচনের ছায়ায় রাজনৈতিক বিতর্ক
পবন খেড়া সুপ্রিম কোর্টে স্বস্তি না পাওয়ার ঘটনাটি কেবল একটি আইনি বিষয় নয় — এর পেছনে রয়েছে আসামের বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে BJP ও কংগ্রেসের তীব্র রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব। ৯ এপ্রিলের আসাম নির্বাচনের ঠিক আগে খেড়ার সংবাদ সম্মেলন সুস্পষ্টভাবে নির্বাচনী কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী প্রকাশ্যে খেড়ার পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং বলেছেন, সত্য প্রকাশের জন্য তাঁকে চুপ করানোর চেষ্টা হচ্ছে। অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেছেন, নির্বাচনের আগে মিথ্যা ও AI-নির্মিত নথি ছড়িয়ে জনমত বিভ্রান্ত করার চেষ্টার কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দি জেলার মানুষদের জন্য এই মামলাটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। আসামের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে বিরোধী দলের অভিযোগ এবং সেই অভিযোগের আইনি পরিণতি — এই সব কিছু সরাসরি প্রভাব ফেলে লালা ও হাইলাকান্দির সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন রাজনৈতিক সচেতনতায়।
এখন প্রশ্ন হল — সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে পবন খেড়া কবে আসামের আদালতে আগাম জামিনের আবেদন করবেন এবং সেই আবেদন কতটা দ্রুত শোনা হবে। আদালত যদি দ্রুত সিদ্ধান্ত না দেয়, তাহলে গ্রেফতারের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। কংগ্রেস ইতিমধ্যেই এই গোটা বিষয়কে “রাজনৈতিক প্রতিহিংসার উদাহরণ” হিসেবে তুলে ধরেছে। পাসপোর্ট বিতর্কের আইনি ও রাজনৈতিক মীমাংসা আসামের আগামী দিনের রাজনৈতিক পরিবেশ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।