এলপিজি সিলিন্ডার ডেলিভারিতে ভারত এক নতুন রেকর্ড স্থাপন করেছে। কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়েছে, গত ১৬ এপ্রিল বুধবার মাত্র একটি দিনে সারা দেশে প্রায় ৫০ লক্ষ LPG সিলিন্ডার সরাসরি পরিবারের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এই পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়, যা দেশের গ্যাস বিতরণ অবকাঠামোর সক্ষমতার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই বিপুল বিতরণ কার্যক্রমে রাষ্ট্রায়ত্ত তিনটি তেল বিপণন সংস্থা — ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন (IOC), ভারত পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (BPCL) এবং হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (HPCL) — একযোগে অংশ নিয়েছে।
কীভাবে সম্ভব হল এই বিশাল বিতরণ?
একটি মাত্র দিনে ৫০ লক্ষ এলপিজি সিলিন্ডার ডেলিভারি দেওয়া নিঃসন্দেহে একটি অসাধারণ লজিস্টিক্যাল সাফল্য। দেশজুড়ে গ্যাস বিতরণ কেন্দ্র বা ডিস্ট্রিবিউটরশিপ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এই সংখ্যক সিলিন্ডার পৌঁছে দিতে পারার পেছনে রয়েছে বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী সরবরাহ শৃঙ্খল। বর্তমানে ভারতে সক্রিয় LPG গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ৩২ কোটি — এই বিশাল গ্রাহকভিত্তিকে নিয়মিত সেবা দিতে সারা দেশে হাজার হাজার বেসরকারি ডিলার ও গ্যাস এজেন্সি কাজ করে। ডিজিটাল বুকিং, অনলাইন পেমেন্ট এবং সরাসরি বাড়িতে ডেলিভারির ব্যবস্থা পুরো প্রক্রিয়াটি দ্রুততর করেছে।
এই রেকর্ড ডেলিভারির দিনটি ছিল বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন — অর্থাৎ পহেলা বৈশাখ। উৎসবের মৌসুমে রান্নার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই সিলিন্ডারের চাহিদাও বাড়ে। এই পরিস্থিতিতে সরবরাহ ব্যাহত না হয়ে বরং রেকর্ড সংখ্যায় সিলিন্ডার পৌঁছানো গ্যাস কোম্পানিগুলোর সক্রিয় প্রস্তুতির প্রমাণ।
উজ্জ্বলা যোজনা এবং গ্রামীণ পরিবারের রান্নাঘরে পরিবর্তন
এলপিজি সিলিন্ডার ডেলিভারির এই পরিসংখ্যান বুঝতে হলে প্রধানমন্ত্রী উজ্জ্বলা যোজনার প্রেক্ষাপট বোঝা দরকার। ২০১৬ সালে চালু হওয়া এই প্রকল্পের আওতায় দেশের দরিদ্র পরিবারগুলোকে বিনামূল্যে বা ভর্তুকিতে LPG সংযোগ দেওয়া হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত উজ্জ্বলা যোজনার আওতায় প্রায় ১০ কোটি পরিবারকে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়েছে — যাদের বেশিরভাগ গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাসিন্দা। এই প্রকল্পের ফলে দেশের গ্যাস গ্রাহকের মোট সংখ্যা দ্রুতগতিতে বেড়েছে, যা সামগ্রিক ডেলিভারির পরিমাণকেও বাড়িয়েছে।
বর্তমানে ভারত সরকার LPG সিলিন্ডারের মূল্য নির্ধারণে একটি ভারসাম্যমূলক নীতি অনুসরণ করছে। সাধারণ গার্হস্থ্য সিলিন্ডারের দাম বাজার-নির্ভর হলেও উজ্জ্বলা যোজনার সুবিধাভোগী পরিবারগুলোর জন্য প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক সিলিন্ডারে ভর্তুকি অব্যাহত রয়েছে। এই নীতির ফলেই গ্রামীণ এলাকায় গ্যাসের ব্যবহার বেড়েছে এবং কাঠ বা কয়লার চুলার পরিবর্তে পরিষ্কার রান্নাঘরের দিকে পরিবারগুলো ঝুঁকছে।
হাইলাকান্দি ও বরাক উপত্যকায় LPG: সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ
লালা শহর ও হাইলাকান্দি জেলার পরিবারগুলোর জন্য এলপিজি সিলিন্ডার ডেলিভারির এই জাতীয় চিত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। বরাক উপত্যকায় — বিশেষত হাইলাকান্দি, করিমগঞ্জ ও কাছাড় জেলায় — উজ্জ্বলা যোজনার সুবিধাভোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। গ্রামীণ ও চা-বাগান এলাকার বহু পরিবার এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রথমবার রান্নার গ্যাস পেয়েছেন।
তবে বরাক উপত্যকায় LPG ডেলিভারি নিয়ে দীর্ঘদিনের কিছু সমস্যাও রয়েছে। প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে ডিলার নেটওয়ার্কের ঘাটতি, বুকিং করার পর দেরিতে সিলিন্ডার পাওয়া এবং কখনো কখনো অতিরিক্ত দাম নেওয়ার অভিযোগ মাঝে মাঝেই সামনে আসে। লালা এলাকায় কয়েকটি অনুমোদিত গ্যাস এজেন্সি থাকলেও চাহিদার তুলনায় সরবরাহ সবসময় সুষম হয় না। কেন্দ্রীয় সরকারের রেকর্ড ডেলিভারির এই পরিসংখ্যান যদি মাঠ পর্যায়ে বরাক উপত্যকার বাস্তবতায় প্রতিফলিত হয়, তাহলে লালা ও হাইলাকান্দির গ্রামীণ পরিবারগুলো সত্যিকারের সুবিধা পাবেন।
এলপিজি সিলিন্ডার ডেলিভারিতে এই রেকর্ড কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য একটি ইতিবাচক প্রচারমূলক বার্তা হলেও এর টেকসই প্রভাব নির্ভর করবে সরবরাহ শৃঙ্খলের নিচের স্তরে — জেলা ও ব্লক পর্যায়ে — কার্যকর বিতরণ ব্যবস্থার উপর। আসামের মতো ভৌগোলিকভাবে বৈচিত্র্যময় রাজ্যে, যেখানে বন্যাপ্রবণ সমভূমি থেকে পাহাড়ি অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত জনপদে মানুষ বাস করেন, সেখানে প্রতিদিনের গ্যাস সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারের লক্ষ্য যদি সত্যিই হয় প্রতিটি পরিবারের রান্নাঘরে পরিষ্কার জ্বালানি পৌঁছে দেওয়া, তাহলে রেকর্ড সংখ্যার পাশাপাশি সমতাভিত্তিক বিতরণের দিকেও মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।