আসামে জ্বালানি সংকট নেই — এই স্পষ্ট বার্তাই দিল ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন লিমিটেড (IOCL)। বৈশ্বিক পর্যায়ে তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ার প্রেক্ষাপটে আসাম ও মণিপুরের বাসিন্দাদের মধ্যে জ্বালানি নিয়ে একটি আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। সেই পরিস্থিতিতে IOCL-এর উত্তর-পূর্ব বিভাগ আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, এই দুই রাজ্যে LPG সিলিন্ডার, পেট্রোল ও ডিজেলের মজুত সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে কোনো বিঘ্ন নেই। সাধারণ মানুষকে গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে এবং প্যানিক বায়িং বা মজুত করার প্রয়োজন নেই বলেও স্পষ্ট করা হয়েছে।
কেন তৈরি হয়েছিল এই উদ্বেগ?
সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক তেলবাজারে অনিশ্চয়তার কারণে ভারতসহ বিভিন্ন দেশে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং কিছু প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশে উৎপাদন পরিবর্তনের খবর আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় আসার পর থেকেই ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে জ্বালানির মজুত নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। উত্তর-পূর্ব ভারতে, বিশেষত আসাম ও মণিপুরে, এই উদ্বেগ একটু বেশিই অনুভূত হয়েছে — কারণ এই অঞ্চলের জ্বালানি সরবরাহ মূলত দেশের অন্যান্য প্রান্ত থেকে পরিবহনের উপর নির্ভরশীল। সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে মাঝে মাঝেই সড়ক অবরোধ বা দুর্যোগের কারণে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার ইতিহাস থাকায় এই ধরনের আন্তর্জাতিক সংবাদ স্থানীয়ভাবে বাড়তি উদ্বেগ তৈরি করে।
IOCL জানিয়েছে, পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সংস্থার উত্তর-পূর্ব বিভাগের মুখপাত্র স্পষ্ট জানান যে আসাম ও মণিপুরে LPG-র মজুত চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট পরিমাণে রয়েছে এবং পেট্রোল-ডিজেলের সরবরাহেও কোনো সমস্যা নেই। তিনি আরও বলেন, স্থানীয় ডিলার ও পাম্পগুলোতে নিয়মিত সরবরাহ পৌঁছাচ্ছে এবং যে কোনো পরিস্থিতিতে সরবরাহ অব্যাহত রাখতে IOCL প্রস্তুত।
আসামের জ্বালানি সরবরাহ কাঠামো ও IOCL-এর ভূমিকা
উত্তর-পূর্ব ভারতে জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে IOCL একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। আসামের নুমালিগড় রিফাইনারি এবং গুয়াহাটি রিফাইনারি এই অঞ্চলের জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করে। আসামে নিজস্ব তেল উৎপাদন ও শোধনাগার থাকায় অন্য রাজ্যের তুলনায় এই অঞ্চলটি জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে কিছুটা কম নির্ভরশীল। তবে LPG সিলিন্ডারের ক্ষেত্রে বটলিং প্ল্যান্ট থেকে সড়ক পথে বিতরণ কেন্দ্র পর্যন্ত একটি সুশৃঙ্খল সরবরাহ শৃঙ্খল বজায় রাখা প্রয়োজন।
IOCL-এর আওতায় উত্তর-পূর্বে শত শত LPG ডিস্ট্রিবিউটর ও হাজার হাজার পেট্রোল পাম্প রয়েছে। আসামে ইন্ডেন গ্যাস ব্র্যান্ডের মাধ্যমে LPG বিতরণ করা হয় এবং গ্রামীণ এলাকায় উজ্জ্বলা যোজনার সুবিধাভোগীরাও এই নেটওয়ার্কের অন্তর্ভুক্ত। IOCL-এর বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিদ্যমান মজুত ও পরিবহন ব্যবস্থা দিয়ে আগামী কয়েক সপ্তাহের চাহিদা অনায়াসে মেটানো সম্ভব।
হাইলাকান্দি ও লালার বাসিন্দাদের জন্য বার্তা
লালা শহর ও হাইলাকান্দি জেলার পরিবারগুলোর জন্য IOCL-এর এই নিশ্চয়তা সরাসরি প্রাসঙ্গিক। বরাক উপত্যকার এই জেলায় হাজার হাজার পরিবার রান্নার জ্বালানি হিসেবে LPG-র উপর নির্ভরশীল। উজ্জ্বলা যোজনার আওতায় সংযোগ পাওয়া দরিদ্র পরিবারগুলো যেখানে গ্যাস সিলিন্ডারকে তাদের একমাত্র পরিষ্কার রান্নার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছেন, সেখানে সরবরাহ বিঘ্নের খবর স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ জাগায়। আসামে জ্বালানি সংকট নেই বলে IOCL-এর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা তাই এই পরিবারগুলোর জন্য একটি স্বস্তির বার্তা।
তবে স্থানীয় গ্যাস ডিলার ও পেট্রোল পাম্প মালিকরা জানিয়েছেন, কোনো কোনো এলাকায় গুজবের কারণে হঠাৎ করে সিলিন্ডারের বাড়তি চাহিদা তৈরি হলে সাময়িক বিলম্ব হতে পারে। তাই IOCL এবং স্থানীয় প্রশাসন উভয়েই অনুরোধ করছে — প্রয়োজনের বাইরে অতিরিক্ত সিলিন্ডার বা জ্বালানি মজুত না করা হোক। প্যানিক বায়িং আসলে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে, যেখানে কোনো প্রকৃত ঘাটতি নেই।
বৈশ্বিক তেলবাজারে অনিশ্চয়তা আগামী দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকতে পারে। কিন্তু আসামের নিজস্ব শোধনাগার সক্ষমতা এবং IOCL-এর শক্তিশালী আঞ্চলিক বিতরণ কাঠামো এই রাজ্যকে তাৎক্ষণিক সংকট থেকে সুরক্ষিত রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঢাল হিসেবে কাজ করছে। পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে IOCL এবং যেকোনো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।