Read today's news --> Click here

চা নিলাম বাধ্যবাধকতা বাতিলের দাবি — আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের চা সংগঠন PM মোদিকে চিঠি দিল

চা নিলাম বাধ্যবাধকতার বিরুদ্ধে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের চা শিল্পের শীর্ষ সংগঠনগুলো এবার সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দরজায় কড়া নেড়েছে। ১০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে চারটি বিশিষ্ট চা শিল্প সংগঠন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে একটি যৌথ স্মারকপত্র পাঠিয়েছে। তাতে দাবি করা হয়েছে, বার্ষিক উৎপাদনের ন্যূনতম ৫০ শতাংশ পাবলিক নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করার যে বিধান রয়েছে, তা অবিলম্বে বাতিল বা সংশোধন করতে হবে। সংগঠনগুলোর যুক্তি স্পষ্ট — এই বাধ্যবাধকতা উৎপাদকদের আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং ভারত সরকারের নিজস্ব Ease of Doing Business নীতির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

কারা লিখলেন এই চিঠি এবং কী দাবি?

স্মারকপত্রে স্বাক্ষর করেছে চারটি সংগঠন — অসম বট লিফ টি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (ABLTMA), নর্থ ইস্টার্ন টি অ্যাসোসিয়েশন (NETA), ভারতীয় চা পরিষদ (BCP) এবং নর্থ বেঙ্গল টি প্রডিউসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন (NBTPWA)। এই চারটি সংগঠন মিলিয়ে উত্তর ভারতের চা উৎপাদনের একটি বড় অংশ প্রতিনিধিত্ব করে। উল্লেখযোগ্য যে, আসাম একা ভারতের মোট চা উৎপাদনের প্রায় ৫০ শতাংশ এবং পশ্চিমবঙ্গ প্রায় ৩০ শতাংশ উৎপাদন করে — অর্থাৎ দুটি রাজ্য মিলে দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় ৮৩ শতাংশ আসে এই অঞ্চল থেকে।

চিঠিতে বলা হয়েছে, পাবলিক নিলামের মাধ্যমে চা বিক্রিতে প্রতি কেজিতে প্রায় ১০ টাকা অতিরিক্ত খরচ হয়, যা গড় বিক্রয়মূল্যের প্রায় ৫ শতাংশ এবং অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদকদের নিট লাভের পরিমাণকে ছাড়িয়ে যায়। এর পাশাপাশি নিলামের মাধ্যমে বিক্রিতে লম্বা সময় লাগে, যা ex-factory বিক্রির তুলনায় অনেক বেশি সময়সাপেক্ষ। সংগঠনগুলো আরও জানিয়েছে, ভারত সরকারের অধীনে অন্য কোনো কমোডিটি বোর্ড তার উৎপাদকদের এভাবে বাধ্যতামূলক নিলামে অংশ নিতে বাধ্য করে না — শুধু চা শিল্পের ক্ষেত্রেই এই অসঙ্গতি কেন, সেই প্রশ্নও তোলা হয়েছে।

নিলাম বাধ্যবাধকতা: পুরনো বিবাদ, নতুন চাপ

চা নিলাম বাধ্যবাধকতা নিয়ে আসামের চা শিল্পের আপত্তি নতুন নয়। ২০১৫ সালের Tea (Marketing) Control Order এবং ২০২৪ সালের সংশোধনীতে বার্ষিক উৎপাদনের ৫০ শতাংশ পাবলিক নিলামে বিক্রির বিধান করা হয়। এর বাইরে ডাস্ট গ্রেড চায়ের ১০০ শতাংশ নিলামে বিক্রির একটি পৃথক বিধানও রয়েছে, যা ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে আরও এক বছরের জন্য বাড়ানো হয়েছে।

মার্চ ২০২৬ সালে টি বোর্ড ইন্ডিয়া একটি নতুন সার্কুলার জারি করে সমস্ত নিবন্ধিত চা উৎপাদকদের মনে করিয়ে দেয় যে ৫০ শতাংশ নিলামের বিধান বাধ্যতামূলক এবং লঙ্ঘন করলে গুরুতর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের কমপ্লায়েন্স বিশ্লেষণে দেখা গেছে বহু উৎপাদক এই বিধান মানেননি। টি বোর্ডের এই কঠোর অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতেই সংগঠনগুলো সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

চিঠিতে সংগঠনগুলো আরও বলেছে, টি বোর্ডের নিজস্ব কোনো বিশেষজ্ঞ কমিটিই বাধ্যতামূলক নিলাম বিক্রির সুপারিশ করেনি। তারা দাবি জানিয়েছে, উৎপাদকদের বাজার পরিস্থিতি বিচার করে নিলাম বা সরাসরি বিক্রি — যেকোনো মাধ্যম বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া হোক এবং এই বাধ্যবাধকতাকে মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী হিসেবেও চিহ্নিত করেছে।

হাইলাকান্দি বরাক উপত্যকার চা শিল্পের উপর প্রভাব

লালা ও হাইলাকান্দি এলাকার মানুষের কাছে এই খবরটি নিছক কর্পোরেট লবিইং নয় — এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজার হাজার পরিবারের জীবিকা। হাইলাকান্দি জেলায় ছোট ও মাঝারি চা বাগান রয়েছে এবং বরাক উপত্যকার বেশ কিছু বট লিফ টি উৎপাদক এই নিলাম বিধানের সরাসরি আওতায় পড়েন। কেজিপ্রতি ১০ টাকা অতিরিক্ত নিলাম খরচ ছোট উৎপাদকদের জন্য অনেক বেশি — বিশেষত যখন আন্তর্জাতিক বাজারে চায়ের দাম উঠানামা করছে এবং উৎপাদন খরচ ক্রমেই বাড়ছে।

অন্যদিকে, চা বাগানের শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি এবং বাগানের সামগ্রিক আর্থিক স্বাস্থ্যও নির্ভর করে উৎপাদকের লাভজনকতার উপর। নিলাম বাধ্যবাধকতায় যদি উৎপাদকদের মুনাফা কমে যায়, তার প্রভাব অবশেষে শ্রমিকের মজুরি ও কর্মসংস্থানেও পড়তে পারে — যা বরাক উপত্যকার চা শিল্পনির্ভর পরিবারগুলোর জন্য উদ্বেগজনক।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এখনও এই স্মারকপত্রের কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব দেয়নি। তবে চা শিল্পের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আসাম বিধানসভা নির্বাচনের পরবর্তী পরিবেশে কেন্দ্রীয় সরকার এই দাবি উপেক্ষা করতে পারবে না। আসামের চা শিল্প ভারতের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস — এই শিল্পের আর্থিক সংকট মানে কয়েক লক্ষ কর্মীর রুটি-রোজগারে সরাসরি আঘাত। সরকার যদি নিলাম বিধানে প্রয়োজনীয় নমনীয়তা আনতে পারে, তাহলে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের চা উৎপাদকরা একটু হলেও স্বস্তি পাবেন।

চা নিলাম বাধ্যবাধকতা বাতিলের দাবি — আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের চা সংগঠন PM মোদিকে চিঠি দিল
Scroll to top