
৯ এপ্রিল বৃহস্পতিবার আসামে বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পরেই মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা জানিয়েছেন যে রাজ্যের চূড়ান্ত আসাম ভোটার উপস্থিতি ৮৬ থেকে ৮৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। বিকেল ৫টা পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের সরকারি হিসাবে উপস্থিতি ছিল ৮৪.৪২ শতাংশ। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর মতে, সন্ধ্যার শেষ ভোটারদের হিসাব যুক্ত হলে চূড়ান্ত সংখ্যা আরও বাড়বে। ২০২১ সালের তিন দফার নির্বাচনের তুলনায় এবারের এক দফার নির্বাচনে এই উচ্চ উপস্থিতি আসামের গণতান্ত্রিক পরিপক্কতার স্পষ্ট প্রতিফলন।
ভোটদানের পরিবর্তিত ধারা: হিমন্তের পর্যবেক্ষণ
ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর সাংবাদিকদের সামনে আসা মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা শুধু সংখ্যা নয়, ভোটদানের পরিবর্তিত প্রকৃতি নিয়েও মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, “এবারের নির্বাচনে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে — ভোটাররা সকাল থেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোটকেন্দ্রে এসেছেন, বিশেষত মহিলা ভোটারদের সংখ্যা চোখে পড়ার মতো ছিল।” তিনি আরও জানান, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ভোটকেন্দ্রগুলোয় দীর্ঘ সারি দেখা গেছে সকাল থেকেই — যা ভোটারদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আগ্রহ ও অংশগ্রহণের ইঙ্গিত।
এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে আসামের মোট ভোটার উপস্থিতি ছিল ৮২.০৪ শতাংশ — এবং তখন নির্বাচন হয়েছিল তিনটি পৃথক দফায়। ২০১৬ সালে ছিল ৮৫.৩৪ শতাংশ। এবার একক দফায় রাজ্যের সমস্ত ১২৬টি আসনে একই দিনে ভোট হয়েছে। সেই বিচারে আসাম ভোটার উপস্থিতি ৮৬-৮৭ শতাংশে পৌঁছালে সেটি ২০১৬-র রেকর্ডও ছাড়িয়ে যাবে — এবং আসামের নির্বাচনী ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হবে।
জেলাওয়ারি চিত্র: কোথায় সর্বোচ্চ, কোথায় কম
বিকেল ৫টা পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলাওয়ারি ভোটার উপস্থিতির চিত্র ছিল বৈচিত্র্যময়। সাউথ সালমারা-মানকাচর জেলায় সর্বোচ্চ ৯৪.০৮ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি রেকর্ড হয়েছে — এই বাংলাভাষী সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাটি ঐতিহাসিকভাবেই উচ্চ উপস্থিতির জন্য পরিচিত। ধুবড়ি জেলায় ছিল ৯০.৩৭ শতাংশ এবং বরপেটায় ৮৯.৬৫ শতাংশ। কামরূপ মেট্রোপলিটন — অর্থাৎ গুয়াহাটি — এ সর্বনিম্ন ৭৩.৩৩ শতাংশ উপস্থিতি রেকর্ড হয়েছে, যা শহরাঞ্চলে তুলনামূলক কম উপস্থিতির প্রবণতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।
মুখ্যমন্ত্রীর মতে, গ্রামীণ এলাকায় ভোটার উপস্থিতি সবসময়ই শহর এলাকার তুলনায় বেশি থাকে — এবং এবারও সেই ধারা অব্যাহত ছিল। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন যে চা বাগান এলাকাগুলোতে এবার ভোটার উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আগে কখনো কখনো নিম্নমুখী থাকত। এই পরিবর্তনকে তিনি রাজ্যের সামাজিক ও রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
বিরোধীদের দাবি ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা
উচ্চ ভোটার উপস্থিতি নিয়ে উৎসাহ থাকলেও, বিরোধী দলগুলো নির্বাচন নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন তুলেছে। কংগ্রেস, AJP ও অন্যান্য বিরোধী দল রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে ভোটকেন্দ্রে অনিয়ম, হিংসা ও ভোটার ভয় দেখানোর অভিযোগ দায়ের করেছে। ডিব্রুগড়ের খোয়াং, গোলাঘাটের মেরাপানি ও শোণিতপুরের কিছু এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচন কমিশন এই অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারদের রিপোর্ট চেয়েছে।
AJP-র সভাপতি ও খোয়াং কেন্দ্রের প্রার্থী লুরিনজ্যোতি গোগোই দাবি করেছেন যে পরিত্যক্ত বাড়িতে হিন্দিভাষী বাইরের লোক রাখা হয়েছিল এবং তাঁর দলের তিনজন নেতাকে BJP কর্মীরা আক্রমণ করেছেন। মুখ্যমন্ত্রী এই অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে সামগ্রিক নির্বাচনী পরিবেশের চিত্র হিসেবে তুলে ধরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলক। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, সামগ্রিকভাবে রাজ্যজুড়ে নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবেই সম্পন্ন হয়েছে।
বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দির প্রেক্ষাপট
আসাম ভোটার উপস্থিতির এই জাতীয় চিত্রের সঙ্গে বরাক উপত্যকার পরিসংখ্যান বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। হাইলাকান্দি জেলায় এবারের নির্বাচনে শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে এবং উপস্থিতির হার সন্তোষজনক ছিল বলে জানা গেছে। লালা টাউন ও আশপাশের এলাকা থেকে সকাল থেকেই ভোটারদের উৎসাহী অংশগ্রহণের খবর পাওয়া গেছে। বরাক উপত্যকার তিনটি জেলা — হাইলাকান্দি, কাছাড় ও করিমগঞ্জ — ঐতিহাসিকভাবেই উচ্চ ভোটার উপস্থিতির এলাকা, এবং এবারও সেই ধারা ব্যাহত হয়নি।
বরাক উপত্যকার বাংলাভাষী ভোটারদের জন্য এই নির্বাচন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল — কারণ বেশ কিছু আসনে ভাষা ও পরিচয়ের প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। হাইলাকান্দির লালা, কাটলিছড়া, হাইলাকান্দি সদর ও আলগাপুর — এই চারটি আসনে মোট আটজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন এবং ৪ মে তাঁদের ভাগ্য নির্ধারিত হবে।
৪ মে-র ফলাফলে কী বলবে উচ্চ উপস্থিতি?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চ ভোটার উপস্থিতি সবসময়ই ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে যায় না — বরং এটি প্রায়শই পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হতে পারে। ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে এবং ২০১৪ সালে কেন্দ্রে উচ্চ ভোটার উপস্থিতি পরিবর্তনের বার্তা নিয়ে এসেছিল। আসামে এবার বিরোধী কংগ্রেস-AJP জোট, AIUDF এবং রাইজর দল মিলিয়ে শক্তিশালী বিরোধিতা করেছে — এবং উচ্চ উপস্থিতিতে এই সম্মিলিত বিরোধী ভোট কোনদিকে গেছে, সেটি ৪ মে-র আগে বোঝা কঠিন।
মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা অবশ্য আত্মবিশ্বাসী। তিনি জানিয়েছেন, আসাম ভোটার উপস্থিতির এই উচ্চ হার BJP-র পক্ষে জনরায়ের প্রতিফলন। তিনি আশা করছেন তৃতীয়বারের মতো BJP সরকার গঠন করবে। কিন্তু সেই রায় আসতে অপেক্ষা করতে হবে আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ — ৪ মে যখন কোটি ভোটারের রায় ইভিএম-এর পর্দা থেকে বেরিয়ে আসবে।