
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত সৌরশক্তি সংযোজনে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করেছে। কেন্দ্রীয় নবায়নযোগ্য শক্তি মন্ত্রী প্রহ্লাদ জোশী ৯ এপ্রিল সামাজিক মাধ্যমে জানিয়েছেন যে ভারত সৌরশক্তি রেকর্ড ৪৪.৬১ গিগাওয়াট নতুন ক্ষমতা যোগ করেছে এই অর্থবছরে — যা দেশের ইতিহাসে একটি বছরে সর্বোচ্চ সৌর সংযোজন। এই সাফল্য শুধু সংখ্যার নিরিখে নয়, কৌশলগত দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ — কারণ এই একটি বছরেই ভারত আগের বছরের মোট সংযোজনের প্রায় দ্বিগুণ ক্ষমতা যোগ করেছে। এই অগ্রগতির ফলে নবায়নযোগ্য শক্তিতে ভারত এখন বিশ্বে তৃতীয় স্থানে রয়েছে।
রেকর্ড কতটা বড়? সংখ্যাই বলছে
২০২৪-২৫ সালে ভারতের মোট সৌর সংযোজন ছিল প্রায় ২৩.৮৩ গিগাওয়াট। সেই তুলনায় ২০২৫-২৬ সালে ৪৪.৬১ গিগাওয়াট সংযোজন মানে প্রায় দ্বিগুণ প্রবৃদ্ধি। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রহ্লাদ জোশী নয়া দিল্লিতে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন — “এই অর্জন ভারতের শক্তি নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন এবং বিকশিত ভারতের স্বপ্নের প্রতি আমাদের অবিচল প্রতিশ্রুতির প্রমাণ।” পিআইবি-র বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, এই ৪৪.৬১ গিগাওয়াটের মধ্যে ইউটিলিটি স্কেল প্রকল্প, রুফটপ সোলার এবং PM KUSUM প্রকল্পের অবদান রয়েছে। শুধু মার্চ ২০২৬ মাসেই একমাসে সর্বোচ্চ ৬.৬৫ গিগাওয়াট সৌরশক্তি স্থাপিত হয়েছে।
মোট নবায়নযোগ্য শক্তির হিসাবেও চিত্র উজ্জ্বল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট অ-জীবাশ্ম জ্বালানি ক্ষমতা যোগ হয়েছে ৫৫.২৯ গিগাওয়াট — এটিও একবছরে সর্বোচ্চ, যা আগের বছরের ২৯.৫ গিগাওয়াটের প্রায় দ্বিগুণ। সব মিলিয়ে ভারতের মোট অ-জীবাশ্ম জ্বালানি স্থাপিত ক্ষমতা এখন ২৮৩.৪৬ গিগাওয়াটে পৌঁছেছে। DD News-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর মধ্যে রয়েছে ১৫০.২৬ গিগাওয়াট সৌরশক্তি, ৫৬.০৯ গিগাওয়াট বায়ুশক্তি, ৫১.৪১ গিগাওয়াট বড় জলবিদ্যুৎ, ১১.৭৫ গিগাওয়াট বায়োএনার্জি, ৫.১৭ গিগাওয়াট ক্ষুদ্র জলবিদ্যুৎ এবং ৮.৭৮ গিগাওয়াট পারমাণবিক শক্তি।
বৈশ্বিক মঞ্চে ভারত: তৃতীয় থেকে আরও এগোনোর লক্ষ্য
রিনিউয়েবল এনার্জি স্ট্যাটিস্টিক্স ২০২৬ অনুযায়ী, ভারত নবায়নযোগ্য শক্তিতে স্থাপিত ক্ষমতায় বিশ্বে তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে — ব্রাজিলকে পেছনে ফেলে। এর আগে শীর্ষে রয়েছে চিন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মন্ত্রী জোশী আরও জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের জুনেই ভারত তার মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার ৫০ শতাংশ অ-জীবাশ্ম উৎস থেকে অর্জন করে ফেলেছে — প্যারিস চুক্তিতে নির্ধারিত ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা পাঁচ বছর আগেই পূরণ করে। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে নবায়নযোগ্য শক্তি ভারতের মোট ২০৩ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ চাহিদার ৫১.৫ শতাংশ মেটাচ্ছিল — যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ অনুপাত।
PM সূর্যঘর মুফ্ত বিজলি যোজনা (PM Surya Ghar: Muft Bijli Yojana) এই সাফল্যে বড় ভূমিকা রেখেছে। New Indian Express-এর তথ্য অনুযায়ী, এই প্রকল্পে এখন পর্যন্ত ৩৪.৩ লক্ষ পরিবার উপকৃত হয়েছেন — যার মধ্যে ২২.৭ লক্ষ স্থাপনা শুধু ২০২৫-২৬ সালেই সম্পন্ন হয়েছে। রুফটপ সৌরশক্তির মোট ক্ষমতা এখন ৮.৭১ গিগাওয়াটে পৌঁছেছে। বায়ুশক্তিতেও ভারত ২০২৫-২৬ সালে সর্বোচ্চ ৬.০৫ গিগাওয়াট স্থাপন করেছে, যা আগের বছরের ৪.১৫ গিগাওয়াটের চেয়ে ৪৬ শতাংশ বেশি।
SECI-র ডিভিডেন্ড এবং রাজ্যভিত্তিক নেতৃত্ব
এই ঘোষণার দিনেই সোলার এনার্জি কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া লিমিটেড (SECI) নবায়নযোগ্য শক্তি মন্ত্রণালয়কে ১১৫ কোটি টাকার ডিভিডেন্ড চেক হস্তান্তর করেছে — যা সৌরশক্তি খাতের আর্থিক স্বাস্থ্যের একটি ইতিবাচক সংকেত। রাজস্থান, গুজরাত ও মহারাষ্ট্র এই বার্ষিক সৌর সংযোজনে শীর্ষ অবদানকারী রাজ্য হিসেবে চিহ্নিত। মার্চ মাসের রেকর্ড একমাসিক সংযোজনে শীর্ষ ছিল রাজস্থান, গুজরাত ও তামিলনাড়ু। মন্ত্রী জোশী এই রাজ্যগুলোকে ভারতের পরিষ্কার ও আরও শক্তিনির্ভর ভবিষ্যতের পথচলায় চালিকাশক্তি হিসেবে অভিহিত করেছেন।
আসাম ও বরাক উপত্যকায় সৌরশক্তির সম্ভাবনা
জাতীয় এই রেকর্ডের প্রেক্ষাপটে আসামের নিজস্ব সৌরশক্তি অগ্রযাত্রার চিত্রটিও উল্লেখযোগ্য। EQMagPro-র তথ্য অনুযায়ী, মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ৩,৫০০ মেগাওয়াট সৌরশক্তি উৎপাদনের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। রাজ্যের ইন্টিগ্রেটেড ক্লিন এনার্জি পলিসি (ICEP) ২০৩০ সালের মধ্যে ১,৯০০ মেগাওয়াট রুফটপ সৌরশক্তি স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
PM সূর্যঘর মুফ্ত বিজলি যোজনায় আসাম ইতোমধ্যে উত্তর-পূর্ব ভারতে প্রথম এবং সারা দেশে দশম স্থানে রয়েছে — ৯১,০০০-এরও বেশি রুফটপ স্থাপনা সম্পন্ন হয়েছে বলে আসাম সরকারের বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব জাদব শইকিয়া এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন। হাইলাকান্দি ও লালা টাউনের মতো বরাক উপত্যকার এলাকায় সৌরশক্তির বিস্তার মানে লোড শেডিং কমা, বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয় এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ।
ভবিষ্যতের পথ: ২০৩০-এর লক্ষ্যমাত্রায় ভারত ভারত সৌরশক্তি রেকর্ড সংযোজনের এই সাফল্যের পর এখন প্রশ্ন — ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০০ গিগাওয়াট নবায়নযোগ্য শক্তির জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা কি নির্ধারিত সময়ের আগেই পূরণ হবে? বর্তমান গতিতে সেটি অসম্ভব নয়। আসামের মতো রাজ্যগুলো যদি ৩,৫০০ মেগাওয়াটের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে পারে এবং কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলো আরও শক্তিশালী হয়, তাহলে উত্তর-পূর্ব ভারতও এই সবুজ বিদ্যুৎ বিপ্লবের সমান অংশীদার হতে পারবে। লালা টাউন থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি কোণে সৌরপ্যানেলের আলো ছড়িয়ে পড়ার এই যাত্রা এখন আর স্বপ্ন নয় — এটি পরিমাপযোগ্য বাস্তবতা।