
৯ এপ্রিল বৃহস্পতিবার আসাম বিধানসভা নির্বাচনের দিনে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা গুয়াহাটির আজারার গোরোল এলাকার একটি বুথে ভোট দিলেন। হিমন্ত বিশ্ব শর্মার ভোটদান ঘিরে দিনটি শুধু ভোটের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ রইল না — কংগ্রেস নেতৃত্বকে তীব্র কটাক্ষ, পাসপোর্ট বিতর্কে সরাসরি প্রতিক্রিয়া এবং একজন সাংবাদিকের সঙ্গে ভাষা নিয়ে তীক্ষ্ণ আদানপ্রদান এই দিনটিকে রাজনৈতিকভাবে বিশেষ উল্লেখযোগ্য করে তুলল। স্ত্রী রিণিকি ভূঞা শর্মা এবং দুই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে বুথে এসেছিলেন তিনি।
ভোট দিয়ে কী বললেন মুখ্যমন্ত্রী
ভোটদান সেরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বললেন, “প্রতিটি নাগরিকের মতোই ভোট দেওয়া আমার কর্তব্য। আজকের সিদ্ধান্তই আগামী পাঁচ বছরের জন্য রাজ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। আমি আসামের মানুষকে রাজ্যের উন্নয়নের জন্য ভোট দিতে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি।” জালুকবাড়িতে প্রচারণায় নিজে বেশি মাঠে না থাকলেও BJP কর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারাই সেই দায়িত্ব সামলেছেন বলে জানান তিনি। তাঁর কথায়, “নির্বাচনের পরে আমরা কেন্দ্রের উন্নয়নে কাজ করে যাব।”
ভোটার উপস্থিতি প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী জানান, জালুকবাড়িতে সাধারণত ৭৮-৮০ শতাংশ ভোট পড়ে এবং সারা আসামেও উপস্থিতির হার ৮০ শতাংশের কাছাকাছি থাকে। তিনি বলেন, “অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় আসামে ভোটার অংশগ্রহণ যথেষ্ট বেশি।” সকালে বৃষ্টি হলেও আকাশ পরিষ্কার হওয়ার পর ভোটারদের মধ্যে উৎসাহ ফিরে এসেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। ভোট দেওয়ার আগে কামাখ্যা মন্দির ও দোলগোবিন্দ মন্দিরে পূজো দিয়েছেন।
কংগ্রেস ও পবন খেড়া বিতর্ক: সরাসরি জবাব
নির্বাচনী আবহে কংগ্রেস সম্পর্কে প্রশ্নের মুখে পড়ে মুখ্যমন্ত্রী হিন্দিতে মন্তব্য করেন — “কাহাঁ হ্যায় ইয়ে কংগ্রেস? কাহাঁ রেহতা হ্যায়? ইয়ে ক্যায়া পার্টি হ্যায়?” অর্থাৎ, “এই কংগ্রেস কোথায়? থাকে কোথায়? এটা আবার কোন দল?” — বলে তিনি কংগ্রেসকে কার্যত অস্তিত্বহীন দল হিসেবে উড়িয়ে দেন। এই বক্তব্য বিজেপির দীর্ঘদিনের প্রচারণার ধারাবাহিকতায় — যে কংগ্রেস আসামে প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে।
পাসপোর্ট বিতর্ক প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি কংগ্রেসের মিডিয়া বিভাগের প্রধান পবন খেড়াকে বললেন — তিনি একজন “ভাগোড়া” অর্থাৎ পলাতক। এই মন্তব্য আসে একটি উত্তপ্ত রাজনৈতিক বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে। পবন খেড়া অভিযোগ করেছিলেন যে মুখ্যমন্ত্রীর স্ত্রী রিণিকি ভূঞা শর্মা ভারত, UAE ও মিশরের তিনটি পাসপোর্ট রাখেন এবং তিনি ভারতীয় নাগরিক নন — যা BJP দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। রিণিকি ভূঞা শর্মা এই অভিযোগে খেড়ার বিরুদ্ধে FIR দায়ের করেন এবং আসাম পুলিশ দিল্লিতে তাঁর বাসভবনে তল্লাশিও চালিয়েছিল। হিমন্ত বিশ্ব শর্মা আরও জানান, বিকেল ৫টার পর সব রাজনৈতিক প্রশ্নের উত্তর দেবেন কারণ নির্বাচন কমিশনের নিয়মভঙ্গ করতে চান না।
সাংবাদিকের সঙ্গে ভাষার বিতর্ক
দিনের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত তৈরি হয় যখন একজন সাংবাদিক প্রচারণাকালীন হিমন্ত বিশ্ব শর্মার ভাষাপ্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। মুখ্যমন্ত্রী তীক্ষ্ণভাবে পাল্টা দিয়ে বলেন, তাঁর ভাষা ওই সাংবাদিক যে সংস্থার প্রতিনিধিত্ব করেন তার ভাষার চেয়ে “অনেক ভালো” — এরপর তিনি অন্য প্রশ্নে চলে যান। এই মন্তব্য সামাজিক মাধ্যমে আলোড়ন তোলে এবং বিভিন্ন মহল থেকে আলাদা প্রতিক্রিয়া আসে।
জালুকবাড়িতে ষষ্ঠ জয়ের লড়াই
হিমন্ত বিশ্ব শর্মা জালুকবাড়ি আসনে ২০০১ সাল থেকে প্রতিনিধিত্ব করে আসছেন — প্রথম তিনবার কংগ্রেসের হয়ে এবং পরের দুইবার BJP-র হয়ে। মোট পাঁচবার একটানা জিতে এই আসনে তিনি এখন রাজনৈতিকভাবে প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ২০২১ সালে জালুকবাড়িতে তিনি ১,৩০,৭৬২ ভোট পেয়েছিলেন এবং জয়ের ব্যবধান ছিল ১,০১,৯১১ ভোট — যা রাজ্যের অন্যতম বৃহত্তম ব্যবধান। ২০২৩ সালের পরিসীমা পুনর্নির্ধারণের পর জালুকবাড়িতে এখন ২,১০,৬২৪ জন ভোটার এবং ২৪৭টি বুথ রয়েছে।
এবার তাঁর বিরুদ্ধে কংগ্রেসের প্রার্থী বিদিশা নেওগ। প্রতিযোগিতামূলক হলেও, ঐতিহাসিক ব্যবধান ও রাজ্য সরকারের উন্নয়নমূলক প্রকল্পের সুফলের কারণে বেশিরভাগ পর্যবেক্ষকই হিমন্তকে এগিয়ে রেখেছেন। BJP মহাজোট NDA এবার পরপর তৃতীয় মেয়াদ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মাঠে।
আসাম ও বরাক উপত্যকার প্রেক্ষাপটে তাৎপর্য
হিমন্ত বিশ্ব শর্মার এই ভোটের দিনের বক্তব্য শুধু জালুকবাড়ির রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। হাইলাকান্দি, লালা ও বরাক উপত্যকার মানুষের কাছেও এই নির্বাচনের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ। গত পাঁচ বছরে বরাক উপত্যকায় বেশ কিছু উন্নয়নমূলক প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে — কিন্তু রাস্তা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানে আরও অনেক কাজ বাকি। লালাবাজারের মানুষ চাইছেন পরবর্তী সরকার এই অসম্পূর্ণ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেবে। মুখ্যমন্ত্রী যদি তৃতীয় মেয়াদে ফিরে আসেন, তাহলে বরাক উপত্যকার দীর্ঘমেয়াদি দাবিগুলো পূরণের প্রতিশ্রুতি কতটুকু রক্ষিত হয় — সেটাই দেখার বিষয়।
৪ মে ফলাফলের দিনে স্পষ্ট হবে আসামের মানুষ পরিবর্তন চাইছেন নাকি ধারাবাহিকতায় আস্থা রাখছেন। হিমন্ত বিশ্ব শর্মার আজকের ভোটদান থেকে শুরু করে কংগ্রেসকে কটাক্ষ, পবন খেড়াকে “ভাগোড়া” বলা এবং সাংবাদিকের প্রশ্নে তীক্ষ্ণ পাল্টা — সবকিছু মিলিয়ে এটা স্পষ্ট যে আসামের CM নির্বাচনী মরসুমের শেষ দিনেও পুরোপুরি আক্রমণাত্মক অবস্থানে রয়েছেন।