
৯ এপ্রিল বৃহস্পতিবার, আসাম বিধানসভা নির্বাচনের দিনে হাইলাকান্দি জেলার লালা বিধানসভা কেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো ছিল। লালা বিধানসভায় ভোট ও লালাবাজারে উন্নয়নের দাবি — এই দুটি বিষয় আজকের দিনে একসঙ্গে সামনে এসেছে। লালাবাজার, লালা টাউন ও আশপাশের গ্রামের ভোটাররা কেবল পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে নয়, বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা উন্নয়নের দাবি জানাতেও বুথে এসেছেন বলে স্থানীয় সূত্র জানাচ্ছে। রাস্তা, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থান — এই চারটি দাবি এবারের নির্বাচনে লালা অঞ্চলের মানুষের কণ্ঠে বারবার ফিরে এসেছে।
হাইলাকান্দির ভোটচিত্র: প্রশাসনের প্রস্তুতি ও ভোটার সংখ্যা
হাইলাকান্দি জেলায় ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি আগে থেকেই নিখুঁতভাবে নেওয়া হয়েছিল। Hindustan Samachar Bengali-র তথ্য অনুযায়ী, ২৯ মার্চ গুয়াহাটিতে এক সাংবাদিক সম্মেলনে হাইলাকান্দির জেলাশাসক তথা জেলা নির্বাচন আধিকারিক অভিষেক জৈন জানান, জেলায় মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লক্ষ ৯৯ হাজার ৯৮৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লক্ষ ৫৯ হাজার এবং মহিলা ভোটার ২ লক্ষ ৪০ হাজার। জেলায় হাইলাকান্দি ও আলগাপুর-কাটলিছড়া — এই দুটি বিধানসভা কেন্দ্র মিলিয়ে মোট ২৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ নিয়েছেন।
জেলাশাসক অভিষেক জৈন আরও জানান যে শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করতে জেলায় মডেল ভোটকেন্দ্র ও মহিলা-পরিচালিত ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ভোটারদের জন্য হোম ভোটিং-এর সুবিধাও রাখা হয়েছে। বুথ লেভেল অফিসারদের হেল্প ডেস্কে মোতায়েন করা হয়েছে ভোটারদের সহায়তার জন্য — যা লালাবাজার ও আশপাশের ভোটকেন্দ্রগুলোতেও প্রযোজ্য ছিল।
লালাবাজারে উন্নয়নের দাবি: দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ
লালাবাজার হাইলাকান্দি জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও জনবহুল এলাকা। এখানকার বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে রাস্তার বেহাল দশা, পানীয় জলের অপ্রতুলতা এবং চিকিৎসাসেবার অভাবে ভুগছেন। Assam Tribune-এর মে ২০২৫ সালের একটি বিশেষ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, হাইলাকান্দি জেলার একাধিক গ্রামের বাসিন্দারা পঞ্চায়েত নির্বাচনে ভোট বয়কট করেছিলেন কারণ সরকার রাস্তা, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও পানীয় জলের ব্যবস্থা করেনি। সেই সময়ে এক বয়োজ্যেষ্ঠ বাসিন্দা বলেছিলেন, “স্বাধীনতার পর থেকে আমরা ভোট দিয়ে আসছি, কিন্তু আমাদের দাবি আজও পূরণ হয়নি। রাস্তা নেই, জল নেই, হাসপাতাল নেই।” এই কথাগুলো লালাবাজারের মানুষের মনেরও প্রতিধ্বনি।
তবে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে লালাবাজারের ভোটাররা বয়কটের পথে না গিয়ে বুথে এসেছেন — এটি নিজেই একটি ইতিবাচক বার্তা। তাঁরা বিশ্বাস করেন যে ভোটের মাধ্যমে পরিবর্তন আনা সম্ভব। লালাবাজারের ব্যবসায়ী মহল থেকে কৃষক — সকলের একটাই প্রশ্ন: এই নির্বাচনে যিনি জিতবেন, তিনি কি সত্যিকার অর্থে লালাবাজারের উন্নয়নের কথা বিধানসভায় তুলবেন?
হাইলাকান্দি বিধানসভার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও চা বাগানের ভোট
India TV News-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে হাইলাকান্দি কেন্দ্রে AIUDF-এর প্রার্থী জাকির হুসেন লস্কর ৭১,০৫৭ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছিলেন — এবং BJP-র প্রার্থী মিলন দাসকে ২৩,৭৫৪ ভোটের ব্যবধানে হারিয়েছিলেন। এবার ২০২৬ সালে সেই মিলন দাস BJP থেকেই পুনরায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এবং নির্বাচনের ঠিক আগে পর্যন্ত হাইলাকান্দিতে জোরকদমে প্রচার চালিয়ে গেছেন। Purvanchal Pratidin-এর ভিডিও প্রতিবেদনে দেখা গেছে, হাইলাকান্দির চা বাগান এলাকাতেও ৯ এপ্রিলের ভোটকে ঘিরে ব্যাপক উৎসাহ ছিল — চা শ্রমিক পরিবারগুলোও এবার সক্রিয়ভাবে ভোটে অংশ নিয়েছেন।
Times of India-র বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৩ সালের পরিসীমা পুনর্নির্ধারণের পর হাইলাকান্দি কেন্দ্রের ভৌগোলিক গঠন পাল্টেছে — পূর্বতন কাটলিছড়া কেন্দ্রের একাংশ এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ফলে এবারের ভোটের সমীকরণ অতীতের তুলনায় আলাদা। নতুন ভোটার এলাকা, নতুন জনমিতি — এই পরিবর্তন লালা ও লালাবাজারের ভোটারদের রাজনৈতিক গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
৪ মে পর্যন্ত অপেক্ষা: লালার রায় কোথায় যাবে
লালা বিধানসভা কেন্দ্রে আজকের ভোটদান শেষ হয়েছে। ভোটের বাক্সে জমা হয়েছে লালাবাজার, লালা টাউন ও হাইলাকান্দির লক্ষ লক্ষ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং দীর্ঘদিনের উন্নয়নের দাবি। ৪ মে গণনার দিনে প্রতিটি ভোটের মূল্য বোঝা যাবে। যদি নতুন বিধায়ক সত্যিকার অর্থে লালাবাজারের মানুষের কথা বিধানসভায় তুলে ধরেন — রাস্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের দাবি নিয়ে সরব হন — তবেই এই ভোটদান সার্থক হবে বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সেই প্রত্যাশা নিয়েই লালার মানুষ এখন গণনার দিনের দিকে তাকিয়ে।