
আসাম বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগ্রহণের দিনেই — ৯ এপ্রিল বৃহস্পতিবার — কংগ্রেসের জাতীয় মিডিয়া বিভাগের চেয়ারম্যান পবন খেরা তেলেঙ্গানা হাইকোর্টে একটি জরুরি আবেদন দাখিল করেছেন। GuwahatiPlus-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, পবন খেরা আসাম পুলিশের সম্ভাব্য গ্রেফতার বা হয়রানি থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে তেলেঙ্গানা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন। হায়দরাবাদে অবস্থানকালে এই আবেদন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। নির্বাচনের দিনে এই আইনি পদক্ষেপ দেশের রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে — এবং কংগ্রেস বনাম আসাম সরকারের মধ্যে চলমান রাজনৈতিক লড়াইকে এক নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে।
কেন এই আবেদন: পেছনের প্রেক্ষাপট
পবন খেরা গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আসামে কংগ্রেসের নির্বাচনী প্রচারে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। মার্চ মাসে গুয়াহাটিতে একাধিক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন এবং BJP সরকারের বিভিন্ন নীতির তীব্র সমালোচনা করেন। NDTV-র তথ্য অনুযায়ী, খেরা আসামে প্রচারকালে বলেছিলেন যে হিমন্ত বিশ্বশর্মা “স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে অন্যতম দুর্নীতিগ্রস্ত মুখ্যমন্ত্রী।” এই ধরনের মন্তব্য এবং প্রচারকালীন তৎপরতার পরিপ্রেক্ষিতে আসাম পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে বলে আশঙ্কা থেকেই সম্ভবত তিনি আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন।
উল্লেখযোগ্য যে, ২০২৩ সালেও পবন খেরাকে নিয়ে একটি বিতর্কিত ঘটনা ঘটেছিল। সেবার দিল্লি বিমানবন্দরে তাঁকে যাত্রার মাঝপথে থামিয়ে আসাম পুলিশ একটি মামলায় গ্রেফতার করতে উদ্যত হয়েছিল বলে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছিল এবং সুপ্রিম কোর্ট হস্তক্ষেপ করেছিল। সেই পূর্ব অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখেই এবার নির্বাচনের দিনে তিনি আগেভাগেই হাইকোর্টে সুরক্ষা চাইলেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
তেলেঙ্গানা হাইকোর্টে আবেদন: আইনি ও রাজনৈতিক তাৎপর্য
তেলেঙ্গানা হাইকোর্টে এই আবেদনের আইনি ভিত্তিটি গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত যখন কোনো ব্যক্তি আশঙ্কা করেন যে তাঁকে অন্য কোনো রাজ্যের পুলিশ গ্রেফতার করতে পারে, তখন তিনি নিজে যে রাজ্যে অবস্থান করছেন, সেই রাজ্যের হাইকোর্টে অগ্রিম জামিন বা সুরক্ষার আবেদন করতে পারেন। খেরা হায়দরাবাদে থাকাকালীন এই আবেদন দাখিল করেছেন, এবং তেলেঙ্গানায় বর্তমানে কংগ্রেস সরকার ক্ষমতায় রয়েছে — তাই সেখানে থেকে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হওয়াটাকে রাজনৈতিকভাবেও কৌশলগত বলে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
GuwahatiPlus-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, খেরার পক্ষে আদালতে বলা হয়েছে যে আসামের রাজনৈতিক পরিবেশে বিরোধী নেতাদের বিরুদ্ধে আইনের অপব্যবহার হতে পারে এবং তাই আগাম সুরক্ষা প্রয়োজন। কংগ্রেস দলের পক্ষ থেকে এই পদক্ষেপকে “BJP সরকারের রাজনৈতিক প্রতিশোধস্পৃহার” বিরুদ্ধে স্বাভাবিক আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ বলে বর্ণনা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, আসাম সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া এখনো জানানো হয়নি।
হিমন্ত-খেরা দ্বন্দ্ব: নির্বাচনী প্রচারে রাজনৈতিক সংঘাতের ধারা
পবন খেরা এবং হিমন্ত বিশ্বশর্মার মধ্যে এই নির্বাচনী মৌসুমে একাধিকবার সরাসরি কথার লড়াই হয়েছে। India Today NE-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভোটের দিনেই হিমন্ত বিশ্বশর্মা জালুকবাড়িতে ভোট দিয়ে বেরিয়ে পবন খেরাকে “ভাগোড়া” বলে সম্বোধন করেছিলেন — এবং কংগ্রেসের অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছিলেন। সেই মন্তব্যের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই খেরার তেলেঙ্গানা হাইকোর্টে যাওয়ার খবর এলো — এবং রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা দুটি ঘটনাকে একই সূত্রে দেখছেন।
কংগ্রেস নেতারা বলছেন, হিমন্ত সরকার বিরোধী প্রচারকারীদের হেনস্থা করতে রাজ্য পুলিশকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। BJP-র পক্ষ থেকে অবশ্য এই অভিযোগ খারিজ করে বলা হচ্ছে, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলে এবং রাজনৈতিক পরিচয় দেখে পুলিশ কাউকে ছাড় দেয় না বা টার্গেট করে না। এই দুটি অবস্থানের মধ্যে যে উত্তেজনা, সেটিই এবারের আসাম নির্বাচনের একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ চিত্র।
আসাম ও বরাক উপত্যকায় এই দ্বন্দ্বের প্রতিধ্বনি
পবন খেরা ও আসাম পুলিশের এই আইনি লড়াই সরাসরি হাইলাকান্দি বা লালা টাউনের বিষয় নয় — কিন্তু পরোক্ষভাবে এটি বরাক উপত্যকার মানুষের কাছে প্রাসঙ্গিক। কারণ এই ঘটনা প্রশ্ন তোলে — রাজ্যে বিরোধী মতের স্থান কতটুকু? নির্বাচনের দিনে একজন জাতীয় স্তরের বিরোধী নেতা যদি গ্রেফতার-আশঙ্কায় আদালতে যান, তাহলে স্থানীয় স্তরের ছোট বিরোধী নেতা ও কর্মীরা কতটা নিরাপদ বোধ করছেন? এই প্রশ্নগুলো হাইলাকান্দির রাজনৈতিকভাবে সচেতন মানুষের মনে উঠছে — বিশেষত যেখানে লালা কেন্দ্রে সংখ্যালঘু ও বিরোধী ভোটারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ রয়েছেন।
৪ মে পর্যন্ত: মামলার ভবিষ্যৎ এবং রাজনৈতিক পরিণতি তেলেঙ্গানা হাইকোর্টে পবন খেরার আবেদন এখন বিচারাধীন। আদালত কী সিদ্ধান্ত দেয়, সেটা আইনি দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু রাজনৈতিক দিক থেকে এই ঘটনার আসল পরীক্ষা হবে ৪ মে — যেদিন আসাম নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা হবে। যদি কংগ্রেস-নেতৃত্বাধীন মহাজোট ভালো ফলাফল করে, তাহলে খেরার প্রচারমূলক তৎপরতা ও এই আইনি লড়াই একটি ভিন্ন আলোয় দেখা যাবে। আর যদি BJP জেতে, তাহলে এই মামলাটি কীদিকে গড়ায়, তা নিয়ে নতুন রাজনৈতিক জল্পনা শুরু হবে। আপাতত সব প্রশ্নের উত্তর অপেক্ষায় — ব্যালটবাক্সের রায়ের জন্য।