Read today's news --> Click here

চরম সংকটে মধ্যপ্রাচ্য: ইরানে মার্কিন হামলায় নিহত সাধারণ নাগরিক, ইরাক ছাড়ার নির্দেশ আমেরিকার; ঘনিয়ে আসছে বৃহত্তর যুদ্ধের মেঘ

আমেরিকা, ইজরায়েল এবং ইরানের মধ্যে চলমান বহুমুখী যুদ্ধ এক মাস পেরিয়ে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, বিশ্ব এখন এক বৃহত্তর যুদ্ধের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। এই সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) প্রায় অবরুদ্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ৪ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং জাহাজ চলাচল ৯৪ শতাংশ কমেছে। ব্রিটেনের বিদেশ সচিব ইয়েভেট কুপারের নেতৃত্বে ৪০টি দেশ এই প্রণালী পুনরায় চালুর দাবিতে একটি ভার্চুয়াল বৈঠক করেছে। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল জানিয়েছেন, বিদেশ সচিব ওই বৈঠকে অংশ নিয়েছেন এবং এলপিজি ও এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ইতিমধ্যে ছয়টি ভারতীয় জাহাজ নিরাপদে প্রণালীটি অতিক্রম করেছে। ইতালির বিদেশমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি আফ্রিকায় খাদ্য সংকট এড়াতে সারের জন্য একটি ‘মানবিক করিডোর’ তৈরির প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রণালীতে যান চলাচল সুরক্ষিত করতে নিরাপত্তা পরিষদে বাহরিনের আনা একটি প্রস্তাব নিয়ে ভোটাভুটির কথা থাকলেও, জিসিসি (GCC)-র মহাসচিব জাসেম মহম্মদ আলবুদাইউই প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়ার আর্জি জানিয়েছেন। এর মাঝেই ইরানের উপ-বিদেশমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি এবং ওমান জাহাজ চলাচলে নজরদারির জন্য একটি খসড়া চুক্তি তৈরি করছে। ইতিমধ্যে তিনটি ওমানি জাহাজ (দুটি তেল ট্যাঙ্কার ও একটি এলএনজি ক্যারিয়ার) এআইএস (AIS) চালু রেখে লারাক দ্বীপের বদলে ওমান উপকূল ঘেঁষে যাতায়াত করেছে। অন্যদিকে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন মিশরের বিদেশমন্ত্রী বদর আবদেলআত্তির সাথে কথা বলে পরিস্থিতি শান্ত করতে সাহায্যের প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রাক্তন মন্ত্রী এম জে আকবর এই যুদ্ধকে নতুন বিশ্বব্যবস্থা তৈরির এক ‘সহিংস গর্ভাবস্থা’ বলে মন্তব্য করেছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোশ্যাল মিডিয়ায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে, আমেরিকা এখনও ধ্বংসলীলা শুরুই করেনি এবং পরবর্তী লক্ষ্য হলো ইরানের সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলি। ‘টাইম ম্যাগাজিন’-এ ট্রাম্প দাবি করেছেন যে তিনি যুদ্ধ থামাতে বললে ইজরায়েল তা মেনে নেবে। ট্রাম্পের দাবি সত্ত্বেও সিএনএন (CNN)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরানের মিসাইল উৎক্ষেপণের ক্ষমতা এখনও অনেকটাই অক্ষত রয়েছে। তেহরান ও কারাজের মধ্যে সংযোগকারী বি১ (B1) সেতুতে মার্কিন হামলায় অন্তত ৮ জন সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং ‘নেচার ডে’ বা পার্সি নববর্ষ পালন করতে আসা ৯৫ জন আহত হয়েছেন। এই হামলার তীব্র নিন্দা করে ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন যে, আমেরিকার সাথে আলোচনার পথ ‘চিরকালের জন্য বন্ধ’ হয়ে গেছে। যদিও মার্কিন বিদেশ দপ্তরের মুখপাত্র পিগট জানিয়েছেন, ট্রাম্প এখনও কূটনীতির জন্য প্রস্তুত। কারাজে হামলার পালটা হিসেবে ফারস (Fars) নিউজ এজেন্সি উপসাগরীয় দেশগুলির ৮টি গুরুত্বপূর্ণ সেতুর একটি ‘হিট লিস্ট’ বা সম্ভাব্য লক্ষ্যের তালিকা প্রকাশ করেছে। দেশে প্রতিবাদের জেরে ১৮ বছর বয়সী আমির হোসেইন হাতামিকে ফাঁসি দিয়েছে ইরান এবং সংসদীয় স্পিকার মহম্মদ বাঘের গালিবাফ দাবি করেছেন যে ৭ মিলিয়ন নাগরিক আমেরিকার বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিতে প্রস্তুত। রেড ক্রসের তরফে ইরানে ট্রমা কিট ও চিকিৎসার সরঞ্জামের ঘাটতির আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। অন্যদিকে, ওমান উপকূলে গত মাসে হামলায় নিহত প্রথম ভারতীয় নাবিক দীক্ষিত সোলাঙ্কির মৃতদেহ দেশে ফেরানোর দাবিতে তাঁর বাবা অমৃতলাল ও বোন মিতালি আইনজীবী এস বি তালেকর এবং মাধবী আয়াপ্পানের মাধ্যমে বম্বে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন।

ইরান দাবি করেছে যে তারা মধ্য ইরানের আকাশে দ্বিতীয় একটি মার্কিন এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান গুলি করে নামিয়েছে। পাশাপাশি, ইজরায়েল জানিয়েছে যে মাত্র ছয় ঘণ্টার ব্যবধানে ইরান তাদের দিকে চার দফায় মিসাইল হামলা চালিয়েছে। ইজরায়েলের আপার গ্যালিলির মালকিয়া, কিরিয়াত শমোনা, তেল হাই, মেতুলা এবং তেল আভিভে সাইরেন বেজে ওঠে। লেবানন থেকে হিজবুল্লাহ উত্তর ইজরায়েলে রকেট ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে, যার প্রেক্ষিতে স্পেন, ইতালি ও বেলজিয়াম-সহ ১৮টি ইউরোপীয় দেশ অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে। এর রেশ ছড়িয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলিতেও। কুয়েতের একটি তেল শোধনাগারে ড্রোন হামলার জেরে আগুন ধরে যায় এবং সৌদি আরব গত বৃহস্পতিবার থেকে পাঁচটি ড্রোন প্রতিহত করেছে। আবু ধাবির খলিফা ইকোনমিক জোন (KEZAD)-এর কাছে একটি মিসাইল ধ্বংস করা হয়েছে। আইআরজিসি (IRGC) দুবাইয়ে মার্কিন টেক জায়ান্ট ওরাকল (Oracle)-এর একটি ডেটা সেন্টার এবং বাহরিনে আমেরিকান অ্যালুমিনিয়াম শিল্প ও ইজরায়েলে রাফায়েল অস্ত্র কারখানায় হামলার দাবি করেছে, যদিও দুবাই মিডিয়া অফিস তা অস্বীকার করেছে। বাহরিনেও সতর্কতামূলক সাইরেন বেজেছে। ইরান জর্ডানের আল আজরাক ঘাঁটিতেও ড্রোন হামলার দাবি করেছে। ইরাকে ইরান-সমর্থিত ‘সারায়া আউলিয়া আল-দাম’ গত ২৪ ঘণ্টায় মার্কিন ঘাঁটিতে অন্তত ২৩টি হামলা চালিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বাগদাদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হামলার আশঙ্কায় সমস্ত আমেরিকান নাগরিককে অবিলম্বে ইরাক ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে।

যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক স্তরেও নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। আমেরিকার প্রথম ক্যাথলিক পোপ, পোপ লিও সরাসরি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এই যুদ্ধ থামানোর আর্জি জানিয়েছেন। অস্ট্রিয়া নিজেদের আকাশসীমা মার্কিন সামরিক কাজে ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। অন্যদিকে আমেরিকার পেন্টাগনে বড়সড় রদবদলের অংশ হিসেবে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের নির্দেশে সেনাপ্রধান জেনারেল র‍্যান্ডি জর্জকে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে বলা হয়েছে। মুখপাত্র শন পার্নেল এই খবর নিশ্চিত করেছেন। ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে দায়িত্বে থাকা ওয়েস্ট পয়েন্টের স্নাতক এবং গাল্ফ ওয়ার, ইরাক ও আফগানিস্তানের প্রবীণ সেনানী জর্জের এই আকস্মিক বিদায় পেন্টাগনের শীর্ষকর্তাদের অপসারণের সাম্প্রতিক প্রবণতারই এক নতুন সংযোজন।

চরম সংকটে মধ্যপ্রাচ্য: ইরানে মার্কিন হামলায় নিহত সাধারণ নাগরিক, ইরাক ছাড়ার নির্দেশ আমেরিকার; ঘনিয়ে আসছে বৃহত্তর যুদ্ধের মেঘ
Scroll to top