
এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা আমেরিকা-ইজরায়েল এবং ইরানের যুদ্ধ এবার এক ভয়ংকর রূপ নিয়ে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। বাগদাদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস একটি চূড়ান্ত সতর্কতা জারি করে জানিয়েছে যে, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে মধ্য বাগদাদে ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়ারা হামলা চালাতে পারে। এই আশঙ্কায় সমস্ত আমেরিকান নাগরিককে অবিলম্বে ইরাক ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, ইজরায়েলের ওপর ইরানের তীব্র মিসাইল হামলা অব্যাহত রয়েছে। ইজরায়েলি সেনার মতে, মাত্র ছয় ঘণ্টার ব্যবধানে চার দফায় এই মিসাইল হামলা চালানো হয়, যার ফলে মধ্য ইজরায়েলের কিছু অংশে ক্ষয়ক্ষতি এবং বেশ কয়েকজনের সামান্য আহত হওয়ার খবর মিলেছে। এর পাশাপাশি, লেবাননের ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ উত্তর ইজরায়েলে রকেট ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। পালটা জবাবে ইজরায়েলি সেনার ১৪৬তম ডিভিশন দক্ষিণ লেবাননে অভিযান চালিয়ে হিজবুল্লাহর ১৫ জন সদস্যকে হত্যা করেছে বলে দাবি করেছে।
যুদ্ধের আঁচ উপসাগরীয় দেশগুলির অর্থনীতিতেও আছড়ে পড়েছে। আবুধাবির খলিফা ইকোনমিক জোন (KEZAD)-এর কাছে একটি মিসাইল ধ্বংস করা হলেও তার টুকরো ছিটকে পড়ে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির হাবশান (Habshan) গ্যাস প্ল্যান্টে আগুন ধরে যায় এবং কাজকর্ম ব্যাহত হয়। কুয়েতের বিদ্যুৎ ও জল মন্ত্রক জানিয়েছে যে, ভোরে ইরানের হামলায় তাদের একটি বিদ্যুৎ ও জল পরিশোধন কেন্দ্র (desalination plant) ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানের খাতাম আল-আম্বিয়া সদর দফতর হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে ওই অঞ্চলের সমস্ত আইসিটি (ICT) কোম্পানি এখন তাদের ‘বৈধ লক্ষ্য’। পাশাপাশি ফারস নিউজ এজেন্সির মাধ্যমে কুয়েত, সৌদি আরব এবং জর্ডান-সহ একাধিক দেশের ৮টি প্রধান সেতুর একটি সম্ভাব্য ‘হিট লিস্ট’ প্রকাশ করেছে তেহরান।
এদিকে, ইরানের কারাজে নির্মাণাধীন বি১ (B1) সেতুতে মার্কিন হামলায় অন্তত ৮ জন সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং ‘নেচার ডে’ বা নওরোজ পালন করতে আসা ৯৫ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। দেশের অভ্যন্তরেও কড়া অবস্থান নিচ্ছে ইরান সরকার। সম্প্রতি বিক্ষোভ দেখানোর অপরাধে ১৮ বছর বয়সী আমির হোসেইন হাতামিকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ভারতের জন্য উদ্বেগ বাড়িয়ে ২০০২ সালে তৈরি ‘পিং শুন’ (Ping Shun) নামের একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার গুজরাটের ভাদিনারে আসার কথা থাকলেও, মাঝপথেই সেটি গতিপথ পরিবর্তন করে চিনের ডংইংয়ের (Dongying) দিকে রওনা হয়েছে। গত মাসে ওমান উপকূলে হামলায় নিহত প্রথম ভারতীয় নাবিক দীক্ষিত সোলাঙ্কির মৃতদেহ দেশে ফেরানোর দাবিতে তাঁর বাবা অমৃতলাল ও বোন মিতালি বম্বে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন।
এই ডামাডোলের মাঝেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, আমেরিকার ধ্বংসলীলা এখনও শুরুই হয়নি এবং এরপর ইরানের সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলি গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে। যদিও ‘টাইম ম্যাগাজিন’-এ তিনি দাবি করেছেন, আমেরিকা যুদ্ধ থামালে ইজরায়েলও নির্দেশ মেনে থেমে যাবে। পেন্টাগনেও বড়সড় রদবদল দেখা গেছে; মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের নির্দেশে সেনাপ্রধান জেনারেল র্যান্ডি জর্জকে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে বলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক স্তরেও শান্তি ফেরানোর মরিয়া চেষ্টা চলছে। আমেরিকার প্রথম ক্যাথলিক পোপ, পোপ লিও সরাসরি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এই যুদ্ধ থামানোর আর্জি জানিয়েছেন। অন্যদিকে, চিন এবং রাশিয়ার আপত্তিতে হরমুজ প্রণালীতে শক্তি প্রয়োগের প্রস্তাব থেকে সরে এসে রাষ্ট্রসংঘে একটি অপেক্ষাকৃত নরম খসড়া প্রস্তাব পেশ করেছে বাহরিন, যেখানে শুধুমাত্র আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে।