
গুয়াহাটি / নয়াদিল্লি, ৭ এপ্রিল: ৯ এপ্রিলের বিধানসভা নির্বাচনের মাত্র দু’দিন আগে অসমের রাজনীতিতে তুফান বইছে। পাসপোর্ট বিতর্কে কংগ্রেসের মিডিয়া বিভাগের প্রধান পবন খেড়ার (Pawan Khera) দিল্লির নিজামুদ্দিন ইস্টের (Nizamuddin East) বাড়িতে মঙ্গলবার সকালে তল্লাশি চালিয়েছে অসম পুলিশ ও দিল্লি পুলিশের যৌথ দল । মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা (Himanta Biswa Sarma) শিবসাগর থেকে দাবি করেছেন যে পবন খেড়া পুলিশি তল্লাশির আঁচ পেয়ে দিল্লি ছেড়ে হায়দরাবাদ পালিয়ে গেছেন । যদিও কংগ্রেসের তরফ থেকে এই দাবির কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এখনও পাওয়া যায়নি।
পাসপোর্ট বিতর্কের শুরু কোথায়?
ঘটনার সূত্রপাত গত রবিবার (৬ এপ্রিল)। সেদিন দিল্লি ও গুয়াহাটিতে পরপর দুটি সংবাদ সম্মেলনে পবন খেড়া বিস্ফোরক অভিযোগ তোলেন যে, মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার স্ত্রী রিনিকি ভূয়াঁ শর্মার (Riniki Bhuyan Sarma) কাছে তিনটি বিদেশি পাসপোর্ট রয়েছে — সংযুক্ত আরব আমিরশাহি (UAE), আন্তিগুয়া ও বার্বুডা (Antigua and Barbuda) এবং মিশরের (Egypt) পাসপোর্ট । UAE-র গোল্ডেন কার্ডটি ২০২২ সালের ১৪ মার্চ থেকে ২০২৭ সাল পর্যন্ত বৈধ এবং আন্তিগুয়া পাসপোর্টটি ২০২১ সালের আগস্টে ইস্যু হয়ে ২০৩১ সাল পর্যন্ত বৈধ বলে খেড়া দাবি করেন । এর পাশাপাশি তিনি এও দাবি করেন যে শর্মার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াইওমিং (Wyoming) রাজ্যে একটি লিমিটেড লায়াবিলিটি কোম্পানি (LLC) রয়েছে, যার মূল্য প্রায় ৫৩,০০০ কোটি টাকা ।
রবিবার মধ্যরাতেই রিনিকি ভূয়াঁ শর্মা গুয়াহাটির পানবাজারের ক্রাইম ব্রাঞ্চ থানায় পবন খেড়া ও অন্যদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS), ২০২৩-এর জালিয়াতি সংক্রান্ত ধারায় FIR দায়ের করেন । রিনিকি এই অভিযোগগুলিকে “ভিত্তিহীন এবং সম্পূর্ণ মিথ্যা” বলে উড়িয়ে দিয়ে বলেন, “আমার তিনটি পাসপোর্ট থাকবে কীভাবে? ভারতে দ্বৈত নাগরিকত্ব দেওয়া হয় না।” তিনি আরও বলেন, “এই সব ভুয়ো অভিযোগ, সব AI দিয়ে তৈরি।” FIR দায়েরের পরপরই অসম পুলিশের একটি দল দিল্লি পুলিশের সহায়তায় মঙ্গলবার সকালে খেড়ার বাড়িতে পৌঁছে তল্লাশি শুরু করে। পুলিশ যখন পৌঁছায়, তখন খেড়া বাড়িতে ছিলেন না বলে জানা গেছে ।
হিমন্তের হুঁশিয়ারি ও কংগ্রেসের পাল্টা জবাব
সোমবার গুয়াহাটিতে একটি সংবাদ সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা পবন খেড়ার বিরুদ্ধে “কড়া ব্যবস্থা” নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “কংগ্রেস নেতা পবন খেড়ার বিরুদ্ধে আমি কঠোর পদক্ষেপ নেব, কয়েকদিন অপেক্ষা করুন।” তিনি দাবি করেন যে কংগ্রেস যে দলিলগুলি তার পরিবারের বিদেশি সম্পত্তির প্রমাণ হিসেবে দেখিয়েছে, সেগুলি ডকুমেন্ট শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিবড (Scribd) থেকে চুরি করে বিকৃত করা হয়েছে । শিবসাগর থেকে শর্মা আরও বলেন, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে এবং কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয় ।
অন্যদিকে কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশ (Jairam Ramesh) বলেন যে এই ঘটনা প্রমাণ করে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা “বিচলিত ও ঘাবড়ে গেছেন” । কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে গুয়াহাটিতে আরেকটি জনসভায় দাবি করেন যে বর্তমান সরকারের আমলে অসমে দুর্নীতি বেড়েছে এবং শর্মা কেবল নিজের পরিবারের উন্নয়নের জন্যই কাজ করছেন । খাড়গে আত্মবিশ্বাসের সাথে দাবি করেন, অসমের ১২৬ আসনের মধ্যে কংগ্রেস-নেতৃত্বাধীন জোট ৭২-৭৩টি আসন জিতবে ।
অসম নির্বাচন ও পাসপোর্ট বিতর্ক — স্থানীয় প্রভাব
হাইলাকান্দি ও বরাক উপত্যকার ভোটারদের কাছে এই বিতর্ক বিশেষ মনোযোগ টানছে। নির্বাচনের ঠিক আগে এই জাতীয় মাপের রাজনৈতিক বিস্ফোরণ ভোটারদের মধ্যে চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে। পাসপোর্ট ও বিদেশি সম্পত্তির অভিযোগকে ঘিরে BJP ও কংগ্রেসের এই সর্বোচ্চ মাত্রার রাজনৈতিক উত্তাপ লালাসহ গোটা হাইলাকান্দি জেলার রাজনৈতিক পরিবেশকেও প্রভাবিত করছে। ভারতীয় আইনে একজন নাগরিক একই সাথে দুটি দেশের পাসপোর্ট রাখতে পারেন না, কারণ ভারত দ্বৈত নাগরিকত্ব স্বীকার করে না । এই আইনি প্রেক্ষাপটটি এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে থাকছে।
ভোটের আগে রাজনীতির তাপমাত্রা চরমে
অসম বিধানসভার ১২৬টি আসনে আগামী ৯ এপ্রিল ভোটগ্রহণ এবং ৪ মে ভোট গণনা হওয়ার কথা । ভোটের ঠিক আগের মুহূর্তে পাসপোর্ট বিতর্ক, FIR, পুলিশি তল্লাশি এবং পাল্টাপাল্টি তীব্র অভিযোগে অসমের রাজনীতি একেবারে তপ্ত হয়ে উঠেছে। আদালত ও তদন্ত সংস্থাগুলি শেষ পর্যন্ত এই মামলায় কী সিদ্ধান্ত নেয়, তার ওপর এখন সকলের দৃষ্টি নিবদ্ধ। ভোটের ফলাফল বেরোনোর পর এই মামলার পরবর্তী গতিপথ কোন দিকে যায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।