শিলচরের তারাপুর এলাকায় সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে এক অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপকের বাড়িতে দুষ্কৃতীরা লকার ভেঙে প্রায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের সোনার অলংকার নিয়ে পালিয়ে যায়। শিব বাড়ি রোডের অদূরে খুদিরাম সরণি বাইলেনে অবস্থিত অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক অসিত চক্রবর্তীর বাসভবনে ভোর আনুমানিক তিনটা নাগাদ এই ঘটনা ঘটে । শিলচরে অধ্যাপকের বাড়িতে সোনা চুরির এই ঘটনা পরিবারের জন্য একটি বড় আর্থিক ও মানসিক আঘাত হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষত দুর্গাপুজোর ঠিক কয়েকদিন আগে এই ঘটনা ঘটায় এলাকায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
চুরির বিস্তারিত ঘটনাক্রম
দুষ্কৃতীরা প্রথমে বাড়ির স্লাইডিং দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে, এরপর ঘরে থাকা লকার জোর করে খুলে তার ভেতরে রক্ষিত সোনার অলংকার নিয়ে পালিয়ে যায় । ইন্ডিয়া টুডে এনই-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনার সময় বাড়িতে অধ্যাপক চক্রবর্তীর স্ত্রী সঙ্গীতা চক্রবর্তী এবং তাঁদের দুই কন্যা সাগ্নিকা চক্রবর্তী ও অঙ্কা চক্রবর্তী ঘুমিয়ে ছিলেন, এবং কেউই দুষ্কৃতীদের প্রবেশ বা পলায়নের সময় টের পাননি ।
পরিবারের বরাত দিয়ে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন বাক্স থেকে অলংকার সংগ্রহ করার পর দুষ্কৃতীরা খালি বাক্সগুলি ফেলে রেখে কাছের । পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন যে চুরি হওয়া অলংকারের মধ্যে সঙ্গীতা চক্রবর্তীর বিয়ের গয়না এবং তাঁদের দুই কন্যার বিবাহের জন্য সংরক্ষিত সোনার অলংকারও অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা গত ২৫ থেকে ৩০ বছর ধরে ধীরে ধীরে সঞ্চিত হয়েছিল ।
ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ও তদন্তের অগ্রগতি
পরিবারের হিসাব অনুসারে এক কোটি টাকার বেশি মূল্যের সোনা চুরি হয়েছে, এবং সামগ্রিকভাবে চুরি হওয়া অলংকারের আনুমানিক মূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকা বলে ধরা হচ্ছে । ঘটনার পরপরই পরিবারের সদস্যরা তারাপুর থানায় একটি এফআইআর দায়ের করেন, এবং পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে তদন্ত শুরু করেছে।
যে গলিতে বাড়িটি অবস্থিত, সেখানে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা না থাকায় সন্দেহভাজনদের চিহ্নিত করতে পুলিশের অসুবিধা হচ্ছে বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন । এই তথ্য প্রমাণ করে যে শহরের অভ্যন্তরীণ আবাসিক এলাকাগুলিতে নিরাপত্তা পরিকাঠামোর ঘাটতি এখনও একটি বড় সমস্যা হিসেবে থেকে গেছে, যা তদন্তকারীদের কাজকে আরও জটিল করে তুলছে।
দুর্গাপুজোর আগে বরাক উপত্যকায় চুরির প্রবণতা
শিলচরে অধ্যাপকের বাড়িতে সোনা চুরির এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং সম্প্রতি বরাক উপত্যকায় ঘটে চলা একাধিক চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইন্ডিয়া টুডে এনই-এর একটি পৃথক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঠিক দুইদিন আগে ১৯ সেপ্টেম্বর শিলচরের কালারতলে তিন যুবক এক এলআইসি এজেন্টকে মারধর করে তাঁর কাছ থেকে ২.৫ লক্ষ টাকা নগদ ও একটি সোনার চেইন ছিনিয়ে নেয় । টাইমস অফ ইন্ডিয়ার একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, তার আগে ১৭ সেপ্টেম্বর শ্রীভূমি জেলার পাথারকান্দিতে এক ব্যবসায়ীর সহযোগীকে অপহরণ করে ১৪ লক্ষ টাকা ছিনতাইয়ের অভিযোগে দুই পুলিশ কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়, আর এই ঘটনার মূল চক্রী বলে অভিযুক্ত এক সাব-ইন্সপেক্টর এখনও পলাতক রয়েছেন ।
দুর্গাপুজোর মতো বড় উৎসবের ঠিক আগে এই ধরনের পরপর ঘটনা এলাকাবাসীর মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে যথেষ্ট উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। উৎসবের মৌসুমে সাধারণত মানুষ বাড়িতে জমানো সোনা ও নগদ অর্থ ব্যবহার করেন, ফলে এই সময়টিতে দুষ্কৃতীদের সক্রিয়তা বেড়ে যাওয়ার একটি প্রবণতা দেখা যায় বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতায় ধরা পড়ে।
বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দির জন্য সতর্কবার্তা
শিলচরের এই ঘটনা হাইলাকান্দি জেলা তথা লালা টাউনের বাসিন্দাদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা বহন করে আনে। কাছাড় জেলার প্রধান শহর শিলচরের মতো তুলনামূলকভাবে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় যদি সিসিটিভি নজরদারির অভাবে এমন বড় চুরির ঘটনা ঘটতে পারে, তবে হাইলাকান্দির মতো ছোট শহর ও লালা টাউনের মতো এলাকাতেও একই ধরনের ঝুঁকি বিদ্যমান, যেখানে নিরাপত্তা পরিকাঠামো তুলনামূলকভাবে আরও কম উন্নত।
দুর্গাপুজোর প্রাক্কালে লালা টাউন ও হাইলাকান্দি জেলার বাসিন্দাদের বাড়িতে সোনা ও মূল্যবান সামগ্রী সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এই সময়ে আবাসিক এলাকাগুলিতে টহলদারি বৃদ্ধি এবং সিসিটিভি স্থাপনে উৎসাহ প্রদানের মতো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
আগামী দিনে তদন্তের অগ্রগতি
শিলচরে অধ্যাপকের বাড়িতে সোনা চুরির ঘটনার তদন্ত এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, এবং পুলিশ প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংগ্রহের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজের অভাবে তদন্তকারীদের কাজ কঠিন হলেও আশেপাশের এলাকার ফুটেজ, স্থানীয় তথ্য এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার মাধ্যমে দুষ্কৃতীদের চিহ্নিত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলে জানা গেছে। দুর্গাপুজোর মৌসুমে এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে বরাক উপত্যকা জুড়ে পুলিশ প্রশাসন কী ধরনের সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেয়, তার দিকেই এখন নজর থাকবে এলাকাবাসীর।