আসাম সরকার রাজ্যে দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থার সামগ্রিক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে একটি গ্লোবাল স্কিল সেন্টার নেটওয়ার্ক এবং প্রায় ৮০০টি স্কুলে ফিউচার স্কিলস প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা করছে। দক্ষতা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোগ মন্ত্রী বিশ্বজিৎ দৈমারীর সভাপতিত্বে ২৩ সেপ্টেম্বর জনতা ভবনে অনুষ্ঠিত একাধিক পর্যালোচনা বৈঠকে এই প্রস্তাবগুলি নিয়ে আলোচনা হয়েছে । আসাম গ্লোবাল স্কিল সেন্টার প্রকল্পের এই পরিকল্পনায় গুয়াহাটিকে মূল কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে, যার সাথে তিনটি উপকেন্দ্র যুক্ত থাকবে, যার একটি শিলচরে অবস্থিত হবে বলে জানা গেছে।
গুয়াহাটি প্রধান কেন্দ্র, শিলচরসহ তিন উপকেন্দ্র
প্রস্তাবিত দক্ষতা নেটওয়ার্কে গুয়াহাটিতে একটি গ্লোবাল স্কিল সেন্টার এবং শিলচর, বঙাইগাঁও ও ডিব্রুগড়ে স্যাটেলাইট কেন্দ্র স্থাপনের কথা বলা হয়েছে । মন্ত্রী দৈমারী কর্মসংস্থান, দক্ষতা কেন্দ্র, যুব ক্ষমতায়ন, আইটিআই এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ সংক্রান্ত প্রস্তাবগুলি পর্যালোচনা করেছেন ।
আসামের দক্ষতা উন্নয়ন মিশনের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ইতিমধ্যে ডিব্রুগড়, যোরহাট, উত্তর লক্ষ্মীপুর, তেজপুর, বঙাইগাঁও, কোকরাঝাড়, শিলচর, গুয়াহাটি ও ডিফুতে দক্ষতা কাম চাকরি মেলা আয়োজনের প্রস্তাব রয়েছে, যা বৃষ্টির মৌসুমের পর শুরু হবে বলে জানানো হয়েছে । এই তথ্য প্রমাণ করে যে শিলচরকে ইতিমধ্যে রাজ্যের দক্ষতা উন্নয়ন পরিকাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
৮০০ স্কুলে হাব অ্যান্ড স্পোক মডেলে ফিউচার স্কিলস প্রশিক্ষণ
আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো প্রায় ৮০০টি স্কুলে হাব অ্যান্ড স্পোক মডেলের মাধ্যমে ফিউচার স্কিলস প্রশিক্ষণ প্রবর্তন করা, যার পাশাপাশি আইটিআইগুলির পরিকাঠামো, প্রশিক্ষণ, মূল্যায়ন ও সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা এবং শিক্ষক ও প্রশিক্ষকদের সক্ষমতা বৃদ্ধির কর্মসূচিও পর্যালোচনা করা হয়েছে । নিউজেবল এশিয়ানেট নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বৈঠকে দক্ষতা উন্নয়ন সংক্রান্ত একটি নতুন এক্সটার্নালি এইডেড প্রজেক্ট বা ইএপি নিয়েও আলোচনা হয়েছে, যার লক্ষ্য দক্ষতা উন্নয়ন উদ্যোগগুলিকে বৃহত্তর আর্থিক সহায়তা প্রদান করা ।
এই হাব অ্যান্ড স্পোক মডেল কেন্দ্রীয় সরকারের পিএম-সেতু প্রকল্পের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যার আওতায় দেশজুড়ে ২০০টি হাব ও ৮০০টি স্পোক আইটিআই-কে স্মার্ট ক্লাসরুম, আধুনিক গবেষণাগার, ডিজিটাল কনটেন্ট এবং শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী নতুন কোর্সের মাধ্যমে উন্নত করার পরিকল্পনা রয়েছে । একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে আসামে আইটিআই-এর সংখ্যা ২০১৪ সালের ২৫টি থেকে বর্তমানে ৪৭-এ উন্নীত হয়েছে, এবং আসনসংখ্যা ৫,০৪৮ থেকে বেড়ে ৮,৭৮৮-এ পৌঁছেছে ।
যুব কল্যাণ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ সংক্রান্ত সমান্তরাল আলোচনা
একটি পৃথক বৈঠকে বিভক্তির পর প্রাক্তন ক্রীড়া ও যুব কল্যাণ দপ্তরের পুনর্গঠন নিয়ে আলোচনা হয়েছে, যেখানে ন্যাশনাল ক্যাডেট কর্পস, ভারত স্কাউটস অ্যান্ড গাইডস এবং আসাম যুব কমিশনের প্রতিনিধিরা যুব ক্ষমতায়নের একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরির বিষয়ে আলোচনায় অংশ নিয়েছেন । এছাড়া আদিবাসী ও উপজাতীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতি দপ্তর ২০২৬ সালের প্রস্তাবিত ঐতিজ্য-মিউজিয়াম উৎসব সহ একাধিক প্রস্তাব উপস্থাপন করেছে, যা আদিবাসী ঐতিহ্য ও জাদুঘর-কেন্দ্রিক জনসংযোগের উপর কেন্দ্রীভূত হবে।
গোলাঘাটের দেওপার্বত প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান এবং শোণিতপুরের গড় দৌল ও শ্রী শ্রী গুপ্তেশ্বর দেবালয়ের সংরক্ষণ ও উন্নয়ন প্রস্তাবও পর্যালোচনা করা হয়েছে, পাশাপাশি রংপুর-শিবসাগর ঐতিহাসিক সংকুলের জন্য ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য মর্যাদা প্রাপ্তির রোডম্যাপও বিবেচনা করা হয়েছে । মন্ত্রী দৈমারী বিভিন্ন কর্মসূচির অগ্রগতি পর্যালোচনা করে বিভাগগুলির মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে এই প্রকল্পগুলির কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা যায় ।
হাইলাকান্দি ও লালা টাউনের জন্য এই প্রকল্পের সম্ভাবনা
শিলচরকে গ্লোবাল স্কিল সেন্টার নেটওয়ার্কের একটি উপকেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হাইলাকান্দি জেলা ও লালা টাউনের যুবসমাজের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বরাক উপত্যকার প্রধান শহর হিসেবে শিলচরে যদি এই দক্ষতা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে হাইলাকান্দি জেলার যুবকরাও দূরবর্তী স্থানে না গিয়ে নিজ অঞ্চলের কাছাকাছি আধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধা লাভ করতে পারবেন।
এছাড়া ৮০০টি স্কুলে ফিউচার স্কিলস প্রশিক্ষণ কর্মসূচি যদি হাব অ্যান্ড স্পোক মডেলে সম্প্রসারিত হয়, তবে হাইলাকান্দি জেলার স্কুলগুলিও এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা স্থানীয় শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক পর্যায়েই আধুনিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দিতে পারে। শিলচরে পূর্বেই প্রস্তাবিত দক্ষতা কাম চাকরি মেলার মতো কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে তা হাইলাকান্দি ও লালা টাউনের বেকার যুবক-যুবতীদের জন্যও একটি সহজলভ্য কর্মসংস্থান সংযোগের মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।
আগামী দিনে বাস্তবায়নের দিকে নজর
আসাম গ্লোবাল স্কিল সেন্টার প্রকল্প এখনও পর্যালোচনা ও প্রস্তাবনার পর্যায়ে রয়েছে, এবং এর বাস্তবায়নের জন্য এখনও আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ও অর্থ বরাদ্দ প্রয়োজন হবে। মন্ত্রী দৈমারীর উদ্যোগে বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের যে আহ্বান জানানো হয়েছে, তা প্রমাণ করে সরকার এই বৃহৎ পরিকল্পনাকে দ্রুত বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে নিতে আগ্রহী। শিলচরের উপকেন্দ্র এবং ৮০০ স্কুলে ফিউচার স্কিলস কর্মসূচি কীভাবে চূড়ান্ত রূপ নেয় এবং হাইলাকান্দির মতো জেলাগুলি এই সুবিধার আওতায় আসে কিনা, তা আগামী দিনে স্পষ্ট হবে, এবং বরাক উপত্যকার যুবসমাজ এই অগ্রগতির দিকে আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে থাকবে।