আসামের রাজ্যপাল লক্ষ্মণ প্রসাদ আচার্য বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর কাছাড় জেলা থেকে নেশা মুক্ত ভারত সংকল্প অভিযান আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করেছেন, যার প্রথম পর্যায়ে রাজ্যের দশটি জেলা নির্বাচন করা হয়েছে। এই দশটি জেলার মধ্যে বরাক উপত্যকাকেই প্রথম পর্যায়ের সূচনাস্থল হিসেবে বেছে নিয়েছেন রাজ্যপাল, এবং আজ কাছাড়ে এবং আগামীকাল, শুক্রবার শ্রীভূমি জেলায় তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করবেন। নেশা মুক্ত ভারত সংকল্প অভিযানের এই সূচনা বরাক উপত্যকার জন্য একটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে, কারণ রাজ্যের অন্য যেকোনো অঞ্চলের আগে এই এলাকাতেই কর্মসূচি শুরু হয়েছে।
বিনাকান্দি থেকে নেহরু কলেজ পর্যন্ত রাজ্যপালের কর্মসূচি
বৃহস্পতিবার বিকেল ১টা ৪৫ মিনিট নাগাদ রাজ্যপাল আচার্য প্রথমে বিনাকান্দিতে জেলার এক প্রবীণ বাসিন্দা সুনীলা দাসের বাসভবনে সাক্ষাৎ করতে যাবেন। তাঁর সাথে সাক্ষাতের পর তিনি বিকেল ২টা ৪৫ মিনিটে নেহরু কলেজে নেশা মুক্ত ভারত সংকল্প অভিযান কর্মসূচিতে যোগ দেবেন। কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিকেল ৪টায় নেহরু কলেজ থেকে একটি পদযাত্রা শুরু হয়ে পয়লাপুর বাজারে গিয়ে সমাপ্ত হবে। রাজ্যপাল স্বয়ং প্রায় এক কিলোমিটার এই পথ পদব্রজে অতিক্রম করে মানুষকে নেশামুক্ত ভারত গড়ার আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানাবেন।
শুক্রবার শ্রীভূমি জেলায় একই ধরনের একটি কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে। সকাল ১০টায় জেলা গ্রন্থাগার মিলনায়তন প্রাঙ্গণে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে কর্মসূচি শুরু হবে। পরে মিলনায়তনে তিনি নেশামুক্ত ভারত গড়ার লক্ষ্য নিয়ে বক্তব্য রাখবেন, এবং সেখানেই একটি সম্মিলিত শপথ গ্রহণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে। গ্রন্থাগার প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হওয়া একটি পদযাত্রার মাধ্যমে কর্মসূচি সমাপ্ত হবে, যা স্টেশন রোডে মহাত্মা গান্ধীর মূর্তির পাদদেশে গিয়ে শেষ হবে, যেখানে রাজ্যপাল আচার্য গান্ধী মূর্তিতে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করবেন।
দশ জেলা জুড়ে পদযাত্রার বৃহত্তর পরিকল্পনা
রাজ্যপাল আচার্যের নিজের লেখা একটি সম্পাদকীয় প্রবন্ধ অনুযায়ী, নেশা মুক্ত ভারত অভিযানকে একটি প্রকৃত গণআন্দোলনে রূপান্তরিত করতে রাজভবন, আসাম ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে ২ অক্টোবর পর্যন্ত একটি পদযাত্রা কর্মসূচি চালু করেছে, যা নির্দিষ্ট কর্মসূচি ও পদযাত্রার মাধ্যমে দশটি জেলা অতিক্রম করবে । রাজ্যপাল লিখেছেন, “আসামের ভবিষ্যৎ তার যুবসমাজের হাতে নির্ভরশীল—তাদের স্বপ্ন, তাদের স্বাস্থ্য এবং জাতি গঠনে অবদান রাখার তাদের সক্ষমতা।”
তিনি আরও জানান যে আসাম ইতিমধ্যে নেশা মুক্ত ভারত অভিযানের আওতায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। স্কুল ও কলেজ জুড়ে ১৩.৭৩ লক্ষেরও বেশি শিক্ষার্থী ও যুবকের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে, ১.৯৩ লক্ষেরও বেশি মানুষ নেশামুক্তির শপথ নিয়েছেন, এবং ১৩,০২৮ জন “নেশা মুক্তি মিত্র” হিসেবে এই অভিযানকে সমর্থন করতে নিবন্ধন করিয়েছেন । এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে অভিযানটি ইতিমধ্যে রাজ্যজুড়ে একটি বাস্তব প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।
চিকিৎসা সুবিধা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের নেটওয়ার্ক
রাজ্যপালের সম্পাদকীয় প্রবন্ধ অনুযায়ী, মাদকাসক্তিতে আক্রান্তদের চিকিৎসা সহায়তার জন্য এলজিবি রিজিওনাল ইনস্টিটিউট অফ মেন্টাল হেলথ (শোণিতপুর), জোরহাট মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এবং এইমস গুয়াহাটির পাশাপাশি দিমা হাসাও, দরং, জোরহাট, কার্বি আংলং, কোকরাঝাড়, শিবসাগর, শ্রীভূমি ও তিনসুকিয়া—এই আটটি জেলায় ডি-অ্যাডিকশন কেন্দ্র বর্তমানে কার্যকর রয়েছে । শ্রীভূমি জেলার এই তালিকায় অন্তর্ভুক্তি বরাক উপত্যকার জন্য উল্লেখযোগ্য, কারণ এটি প্রমাণ করে যে এই অঞ্চলে ইতিমধ্যে একটি প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসা কাঠামো গড়ে উঠেছে।
মুখ্যমন্ত্রী ডঃ হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ১৫ সেপ্টেম্বর ঘোষণা করেছেন যে আসাম সরকার রাজ্যের প্রতিটি জেলায় সরকারি পরিচালনাধীন মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন করবে । এই ঘোষণা যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে হাইলাকান্দি জেলাও ভবিষ্যতে নিজস্ব একটি সরকারি ডি-অ্যাডিকশন কেন্দ্র পেতে পারে, যা বর্তমানে প্রতিবেশী জেলার সুবিধার উপর নির্ভরশীল রোগীদের জন্য একটি বড় স্বস্তি হয়ে দাঁড়াবে।
জাতীয় পর্যায়ে অভিযানের অগ্রগতি ও লক্ষ্যমাত্রা
কেন্দ্রীয় সরকারের “নয়া ভারত, নেশা মুক্ত ভারত” অভিযান ইতিমধ্যে দেশজুড়ে ৩৪.৫৪ কোটিরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছেছে । পিআইবি-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ১৫ আগস্ট চালু হওয়া এই অভিযানের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ৩৪.৫৬ কোটিরও বেশি নাগরিকের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে, যার মধ্যে ১৩.৭১ কোটিরও বেশি যুবক এবং ১০.৬৫ কোটি নারী অন্তর্ভুক্ত । বাবুশাহীর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে কেন্দ্র সরকার ২০২৯ সালের মধ্যে একটি “মাদকমুক্ত ভারত” গড়ার লক্ষ্যে জুলাই ২০২৬ থেকে জুলাই ২০২৯ পর্যন্ত একটি তিন বছরের রোডম্যাপ প্রস্তুত করেছে ।
এই জাতীয় প্রেক্ষাপটে আসামের রাজ্যপালের বরাক উপত্যকা থেকে অভিযান শুরু করার সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় সরকারের বৃহত্তর লক্ষ্যমাত্রার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি রাজ্যস্তরীয় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
হাইলাকান্দি ও লালা টাউনের জন্য এই অভিযানের প্রাসঙ্গিকতা
বরাক উপত্যকার তিন জেলার মধ্যে হাইলাকান্দিও একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, এবং রাজ্যপালের এই সূচনা কর্মসূচি কাছাড় ও শ্রীভূমিতে কেন্দ্রীভূত হলেও দশ জেলার পদযাত্রা তালিকায় হাইলাকান্দি অন্তর্ভুক্ত থাকলে লালা টাউনের বাসিন্দারাও সরাসরি এই কর্মসূচির সুবিধা পেতে পারেন। সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ার কারণে হাইলাকান্দিতে মাদক পাচার ও অপব্যবহারের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি, ফলে এই ধরনের সচেতনতামূলক কর্মসূচি স্থানীয় যুবসমাজের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যুব সংগঠন ও সমাজকল্যাণ সংস্থাগুলি যদি “নেশা মুক্তি মিত্র” নেটওয়ার্কে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়, তবে তা হাইলাকান্দি জেলার মাদকবিরোধী প্রচেষ্টাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। কাছাড় ও শ্রীভূমিতে অনুষ্ঠিত কর্মসূচির অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে হাইলাকান্দি জেলা প্রশাসনও ভবিষ্যতে অনুরূপ সচেতনতামূলক কর্মসূচি আয়োজনের উদ্যোগ নিতে পারে।
আগামী দিনের প্রত্যাশা
আগামী দুই সপ্তাহে রাজ্যপালের পদযাত্রা রাজ্যের বাকি জেলাগুলিতেও সম্প্রসারিত হবে, যা নেশা মুক্ত ভারত অভিযানকে একটি প্রকৃত জনআন্দোলনে পরিণত করার লক্ষ্যে পরিচালিত হচ্ছে। মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে পরিচালিত এই অভিযান বরাক উপত্যকা থেকে শুরু হয়ে কীভাবে সমগ্র রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং হাইলাকান্দিসহ অন্যান্য জেলায় এর প্রভাব কতটা গভীর হয়, তার দিকেই এখন নজর থাকবে সমগ্র আসামবাসীর।