শিলচর পৌর নিগম নির্বাচনকে সামনে রেখে আসাম সরকার তিন দিনের জন্য শুকনো দিন ঘোষণা করেছে, যার আওতায় মদ ও অন্যান্য নেশাজাতীয় দ্রব্যের ক্রয়-বিক্রয়, সরবরাহ, মজুত ও সেবন সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ থাকবে। শনিবার জারি করা এক সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে যে ভোটগ্রহণের দিন ৩ অক্টোবর, তার আগের দিন ২ অক্টোবর এবং গণনার দিন ৬ অক্টোবর—এই তিন দিন শিলচর পৌর নিগম এলাকায় এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে । যদি কোনো ওয়ার্ডে পুনর্নির্বাচনের প্রয়োজন হয়, সেক্ষেত্রে সেই দিনটিকেও শুকনো দিন হিসেবে গণ্য করা হবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইনি ভিত্তি ও নিষেধাজ্ঞার বিস্তারিত
জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫১-এর ধারা ১৩৫(সি) এবং আসাম আবগারি বিধি, ২০১৬-এর ৩২৬(এ) বিধি অনুযায়ী এই নির্দেশ জারি করা হয়েছে । নির্দিষ্ট সময়কালে সমস্ত পাইকারি মদের গুদাম এবং আইএমএফএল খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র, যার মধ্যে ‘অফ’ ও ‘অন’ দোকান, ক্লাব ‘অন’, হোটেল ‘অন’ এবং কান্ট্রি স্পিরিট দোকানও অন্তর্ভুক্ত, সম্পূর্ণভাবে বন্ধ থাকবে। ব্যক্তিগতভাবে মদ মজুত রাখার উপরও এই সময়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছে যে এই নির্দেশ লঙ্ঘন করলে আসাম আবগারি আইন ও বিধি এবং জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ১৩৫(সি) ধারার আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে এই শুকনো দিন ঘোষণার মূল উদ্দেশ্য হলো একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ পৌর নির্বাচন নিশ্চিত করা ।
বরাক উপত্যকার প্রথম পৌর নিগম নির্বাচন
শিলচর পৌর নিগম নির্বাচন কেবল একটি সাধারণ ভোটগ্রহণ নয়, বরং এটি বরাক উপত্যকার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। পূর্বতন শিলচর পৌরসভাকে পৌর নিগমে উন্নীত করা হয়েছে এবং নাগরিক সংস্থাটিকে সম্প্রসারিত করে ৪২টি ওয়ার্ডে বিভক্ত করা হয়েছে, ফলে ৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনই হবে শিলচরের প্রথম পৌর নিগম নির্বাচন । আসাম রাজ্য নির্বাচন কমিশন দীর্ঘ প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতার পর ২ সেপ্টেম্বর এই নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণা করে।
মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনে দুইজন বিজেপি প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন—ওয়ার্ড ৯ থেকে বিজেন্দ্র প্রসাদ সিং, যেখানে কংগ্রেস প্রার্থী অমলেন্দু দে এবং এসইউসিআই প্রার্থী অপনলাল দাস মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেন, এবং ওয়ার্ড ২০ থেকে ভক্তি সেন তালুকদার, যেখানে নির্দল প্রার্থী রূপালী দাস মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন । ফলে বাকি ৪০টি ওয়ার্ডে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
প্রার্থী সংখ্যা ও রাজনৈতিক দলগুলির অবস্থান
বিজেপি ৩৮টি ওয়ার্ডে প্রার্থী দিয়েছে, আর তাদের জোটসঙ্গী অসম গণ পরিষদ বাকি চারটি ওয়ার্ডে প্রার্থী দিয়ে সবক’টি ওয়ার্ড কভার করেছে । মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর মোট ১৩১ জন প্রার্থী নির্বাচনী ময়দানে অবশিষ্ট রয়েছেন, যেখান থেকে ১৮ জন প্রার্থী তাঁদের মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন ।
ভোটগ্রহণ সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত চলবে, এবং গণনা শুরু হবে ৬ অক্টোবর সকাল আটটায় । নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে রাজ্য সরকার বিভিন্ন ওয়ার্ডের জন্য নির্বাচনী পর্যবেক্ষক নিয়োগ করেছে বলে জানা যায় ।
বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দির জন্য এই নির্বাচনের তাৎপর্য
শিলচর পৌর নিগম নির্বাচন বরাক উপত্যকার সবচেয়ে বড় শহর কাছাড়ের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করছে। এই নির্বাচনের ফলাফল ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে হাইলাকান্দি জেলা তথা লালা টাউনের নাগরিক প্রশাসন পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও একটি দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়াতে পারে, যদি ভবিষ্যতে অনুরূপ পৌর সংস্থা উন্নীতকরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বরাক উপত্যকার তিনটি জেলার মধ্যে সবচেয়ে জনবহুল শহর হিসেবে শিলচরের এই প্রথম পৌর নিগম নির্বাচন গোটা অঞ্চলের রাজনৈতিক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
লালা টাউনের বাসিন্দাদের জন্যও এই নির্বাচন প্রাসঙ্গিক, কারণ শিলচর বরাক উপত্যকার প্রধান বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র হওয়ায় হাইলাকান্দি জেলার বহু বাসিন্দা নিয়মিত শিক্ষা, চিকিৎসা ও ব্যবসার কাজে শিলচরে যাতায়াত করেন। ফলে শিলচরের নাগরিক প্রশাসনে যে কোনো পরিবর্তন পরোক্ষভাবে হাইলাকান্দি ও লালা টাউনের বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবনকেও প্রভাবিত করে।
আগামী দিনের কর্মসূচি ও প্রত্যাশা
শুকনো দিন ঘোষণার মধ্য দিয়ে শিলচর পৌর নিগম নির্বাচনের প্রস্তুতি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। আগামী কয়েক সপ্তাহে প্রার্থীরা তাঁদের প্রচার কার্যক্রম জোরদার করবেন এবং ৩ অক্টোবর ভোটগ্রহণের মাধ্যমে বরাক উপত্যকার এই ঐতিহাসিক নির্বাচন সম্পন্ন হবে। ৬ অক্টোবর গণনার দিন কে এই নতুন পৌর নিগমের নেতৃত্ব লাভ করেন, তা নির্ধারিত হবে, এবং এই ফলাফল আগামী দিনে শিলচরের নাগরিক পরিষেবা ও উন্নয়ন পরিকল্পনার দিকনির্দেশ ঠিক করবে। সমগ্র বরাক উপত্যকার মানুষ এখন এই নির্বাচনী প্রক্রিয়ার দিকে আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে রয়েছেন।