চা বাগানের জমি ব্যবহার নিয়ে অসম সরকার নতুন বিল উত্থাপন করেছে, যা রাজ্যের ভূমি-নীতি ও চা শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন বিতর্ক ও সম্ভাবনা—দুইই তৈরি করেছে। সোমবার অসম বিধানসভায় রাজস্ব ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী কেশব মহন্ত “The Assam Fixation of Ceiling on Land Holdings (Amendment) Bill, 2026” পেশ করেন । প্রস্তাব অনুযায়ী, চা বাগান মালিকেরা তাদের মোট জমির সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ অংশ অনুমোদিত বাণিজ্যিক বা সহায়ক কার্যক্রমে ব্যবহার করতে পারবেন কিংবা সরকার-নির্ধারিত শর্তে অন্যদের লীজ দিতে পারবেন । রাজস্ব ব্যবস্থার পাশাপাশি এ সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়তে পারে চা শিল্পের বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং জমি ব্যবস্থাপনার ওপর।
বিলের মূল প্রস্তাব কী
চা বাগানের জমি ব্যবহার সংক্রান্ত এই বিলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি “non-core commercial activities” বা মূল চা উৎপাদনের বাইরে অনুমোদিত কাজের জন্য সীমিত জমি ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছে । বিলের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, চা বাগান কর্তৃপক্ষ নিজে এই কার্যক্রম চালাতে পারবে অথবা নির্ধারিত সময়সীমায় অন্য ব্যক্তি বা সংস্থাকে জমির অংশ লীজ দিতে পারবে । অনুমোদিত কাজের মধ্যে রয়েছে eco-friendly tea tourism, food and cash crop cultivation, animal husbandry, green energy projects, social infrastructure এবং food processing unit ।
সরকারের বক্তব্য, এই পরিবর্তনের লক্ষ্য জমির সঠিক ব্যবহার, অতিরিক্ত আয় সৃষ্টি এবং ancillary sectors-এ বিনিয়োগ আকর্ষণ করা । Assam land ceiling framework অনুযায়ী চা বাগানের জমির একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে বিশেষ চাষ ও সহায়ক কার্যক্রমের জন্য সংরক্ষিত ছিল । নতুন সংশোধনী সেই ব্যবস্থার মধ্যেই সীমিত নমনীয়তা আনছে। ফলে এখন প্রশ্ন, ৫ শতাংশ সীমা চা শিল্পকে নতুন আয়ের রাস্তা দেখাবে, না কি জমি-রূপান্তর নিয়ে নতুন উদ্বেগও জন্ম দেবে।
ভূমি সীমা ও আগের নিয়মের প্রেক্ষাপট
চা বাগানের জমি ব্যবহার বুঝতে হলে আগের আইনটি জানা জরুরি। অসম সরকারের ভূমি দফতরের তথ্য অনুযায়ী, চা বাগানকে অতীতে বিশেষ চাষের অংশ হিসেবে ছাড় দেওয়া হলেও factory building, staff quarters, labour line, road, bridge, drain, nursery, hospital, dispensary এবং creche-এর মতো ancillary purposes-এর জন্য আলাদা অনুমোদন ছিল । এর বাইরে থাকা অতিরিক্ত জমি অনেক ক্ষেত্রে ceiling surplus land হিসেবে গণ্য হয়েছে এবং রাজ্যের নিয়ন্ত্রণে এসেছে ।
এই পরিপ্রেক্ষিতে নতুন বিলটি একেবারে ভূমি-বিপ্লব নয়, বরং পুরোনো আইনকে ব্যবহারিক প্রয়োজনে সামঞ্জস্য করার চেষ্টা। ২০২৫ সালে অসম বিধানসভা tea garden workers-এর land rights সংক্রান্ত একটি সংশোধনী পাস করেছিল, যেখানে labour lines-এর আইনি সুরক্ষা ও settlement policy-র ওপর জোর দেওয়া হয় । তার পরের ধাপে এখন বাগানের মালিকদের আয় বাড়ানোর সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ, একইসঙ্গে শ্রমিকের অধিকার এবং বাগান-মালিকের অর্থনৈতিক স্বার্থ—দুটিই আইনপ্রণেতারা ব্যালান্স করার চেষ্টা করছেন বলে মনে হচ্ছে।
চা শিল্পে আয় ও বিনিয়োগের নতুন পথ
চা বাগানের জমি ব্যবহার নিয়ে এই বিলের আরেকটি বড় দিক হলো revenue diversification। বাগানগুলো eco-tourism, food processing, green energy ও livestock-based activities-তে জমি ব্যবহার করতে পারবে । এটি বিশেষত সেই সব এস্টেটের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে চা-উৎপাদন একমাত্র আয়ের উৎস হিসেবে যথেষ্ট আর্থিক স্থিতি দিতে পারছে না।
বনজ, কৃষি ও পর্যটনভিত্তিক হাইব্রিড মডেল বহু tea-growing region-এ পরীক্ষা করা হয়েছে। Assam-এর মতো রাজ্যে, যেখানে ভূমি-চাপ, উৎপাদন খরচ এবং আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা চা শিল্পকে চাপে রাখে, সেখানে সীমিত বাণিজ্যিক ব্যবহার আর্থিক সুরক্ষার একটি বিকল্প হতে পারে । তবে একই সঙ্গে এটাও গুরুত্বপূর্ণ যে, এই ৫ শতাংশ জমি যেন ধীরে ধীরে মূল চা-ভূমি দখলের দরজা না খুলে দেয়। তাই লাইসেন্সিং, পরিবেশগত ছাড়পত্র, এবং জমি-ব্যবহারের স্বচ্ছতা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বরাক উপত্যকা ও স্থানীয় প্রভাব
চা বাগানের জমি ব্যবহার নিয়ে এই বিল সরাসরি বরাক উপত্যকার ঘটনা না হলেও, এর প্রভাব হাইলাকান্দি ও লালা টাউনসহ দক্ষিণ অসমের চা-ভিত্তিক অঞ্চলগুলোর জন্য প্রাসঙ্গিক। বরাক অঞ্চলে বহু চা বাগান শ্রমনির্ভর অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, আর অনেক বাগানেই কর্মী-আবাসন, স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ছোট দোকান ও কৃষিনির্ভর পার্শ্বকার্যক্রম রয়েছে। নতুন বিলের ফলে বাগান মালিকেরা যদি অনুমোদিত পর্যটন বা খাদ্যপ্রক্রিয়াকরণ ইউনিট গড়ে তোলেন, তবে স্থানীয় কর্মসংস্থান বাড়তে পারে ।
তবে স্থানীয় মানুষদের জন্য আরেকটি প্রশ্নও আছে: এই বাণিজ্যিক ব্যবহারের সুবিধা কি শ্রমিক-কলোনির জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করবে, নাকি জমির ওপর চাপ বাড়াবে? হাইলাকান্দি ও কাছাড়ের বহু চা শ্রমিক পরিবার দীর্ঘদিন ধরে জমি, বাসস্থান এবং মৌলিক পরিষেবার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাই চা বাগানের জমি ব্যবহার যদি বাড়ে, তবে সেটি শ্রমিকের স্বার্থ, পরিবেশ ও জমির আইনি সুরক্ষা বজায় রেখে হতে হবে। লালা টাউনের মতো এলাকার মানুষের কাছে এ বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারা জানেন বাগানের অর্থনৈতিক স্বাস্থ্য সরাসরি স্থানীয় বাজার ও কাজের সুযোগকে প্রভাবিত করে।
চা বাগানের জমি ব্যবহার নিয়ে অসমের এই বিল এখনো আইনপ্রণয়ন-পর্যায়ে আছে, তবে এর ইঙ্গিত পরিষ্কার। রাজ্য চা শিল্পকে শুধু উৎপাদনের ক্ষেত্র হিসেবে নয়, বহুমুখী অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে দেখতে চাইছে। আগামী দিনে বিধানসভা আলোচনায় শ্রমিক অধিকার, পরিবেশ, ভূমি-নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগ—এই চারটি বিষয় কতটা ভারসাম্য পায়, সেটাই ঠিক করবে বিলটি কতটা কার্যকর হবে।