কাছাড়ে ভুয়া ডাক্তারের ক্লিনিকে অভিযান চালাল আসাম স্বাস্থ্য দপ্তর। ২১ জুলাই, মঙ্গলবার সকাল প্রায় ১০টা নাগাদ শিলচর থেকে যাওয়া একটি বিশেষ মেডিকেল দল কাছাড় জেলার ভাগাবাজার মণিপুরি মার্কেটে অবস্থিত একটি ক্লিনিকে হানা দেয়, যেখানে দারেন সিনহা নামের এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে বৈধ রেজিস্ট্রেশন ও অনুমতি ছাড়াই চিকিৎসা পরিষেবা দিচ্ছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। ইন্ডিয়া টুডে এনই-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অভিযান একটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে চালানো হয়।
কীভাবে চলল তল্লাশি অভিযান
কাছাড়ে ভুয়া ডাক্তারের ক্লিনিকে এই অভিযানে উপস্থিত ছিলেন ডা. মিসেস চিকদার, সকাত চক্রবর্তী এবং ভাগাবাজার প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ইনচার্জ চেরাব উদ্দিন, সঙ্গে স্বাস্থ্য দপ্তরের অন্য কর্মীরাও। ইন্ডিয়া টুডে এনই জানিয়েছে, স্বাস্থ্য দপ্তরের প্রাথমিক অভিযোগ অনুযায়ী দারেন সিনহা নিজেকে ডাক্তার বলে পরিচয় দিয়ে রোগীদের চিকিৎসা করছিলেন, যদিও তাঁর কাছে কোনো স্বীকৃত মেডিকেল ডিগ্রি বা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছিল না। প্রেসক্রিপশন ছাড়াই ওষুধ বিক্রি এবং বিভিন্ন চিকিৎসা সংক্রান্ত নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে আনা হয়েছে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, এই অভিযানের পেছনে একটি সরাসরি প্ররোচক ঘটনা রয়েছে। সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়, যেখানে অভিযোগ করা হয় একটি শিশু ভুল ইনজেকশন দেওয়ার পর শারীরিক জটিলতায় ভোগে। এই ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের একাধিক অভিযোগের ভিত্তিতে স্বাস্থ্য দপ্তর তদন্ত শুরু করে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ক্লিনিকের রেজিস্ট্রেশন, লাইসেন্স, মেডিকেল যোগ্যতা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র খতিয়ে দেখা হচ্ছে, এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কাছাড়ে ভুয়া ডাক্তার ধরার দীর্ঘ অভিযান
কাছাড়ে ভুয়া ডাক্তারের ক্লিনিকে এই অভিযান বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং জেলা প্রশাসনের একটি দীর্ঘমেয়াদী অভিযানের সাম্প্রতিকতম অংশ। ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে প্রথম ভুয়া ডাক্তার পুলক মালাকার ধরা পড়ার পর থেকে কাছাড় পুলিশ ধারাবাহিকভাবে এই ধরনের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে আসছে। তখনকার এএসপি সুব্রত সেনের বরাত দিয়ে জানা যায়, আগস্ট থেকে অক্টোবরের মধ্যেই জেলায় মোট ১৫ জন ভুয়া ডাক্তার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।
এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুসারে, মাত্র ৯০ দিনের মধ্যে কাছাড় জেলায় ১৭ জন হাতুড়ে চিকিৎসক গ্রেপ্তার হওয়ায় এই জেলা রাজ্যে “ভুয়া ডাক্তারদের হাব” নামে পরিচিতি পায়। এছাড়া ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ধোলাই থানা এলাকার শামিম আহমেদ লস্কর এবং জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) রজত কুমার পালের নেতৃত্বে আরও দুজন ভুয়া ডাক্তার গ্রেপ্তার হন, যা প্রমাণ করে অভিযান এখনও চলমান। অসম মেডিকেল কাউন্সিলের অ্যান্টি-কোয়াকারি অ্যান্ড ভিজিল্যান্স অফিসার ডা. অভিজিৎ নিয়োগীর অভিযোগের ভিত্তিতেও একাধিক অভিযান পরিচালিত হয়েছে বলে আসাম ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
হাইলাকান্দি ও লালা টাউনের জন্য কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ
কাছাড়ে ভুয়া ডাক্তারের ক্লিনিকে এই অভিযান হাইলাকান্দি জেলার বাসিন্দাদের জন্যও একটি সতর্কবার্তা, কারণ ভাগাবাজার এলাকা লালা টাউন থেকে দূরত্বে বেশ কাছাকাছি এবং বরাক উপত্যকার এই জেলাগুলিতে একই ধরনের চিকিৎসা প্রতারণার প্রবণতা আগেও দেখা গেছে। এর আগে সোনাই, কালাইন ও তারাপুরের মতো এলাকায় একাধিক ভুয়া ডাক্তার ধরা পড়েছে, যা প্রমাণ করে এই সমস্যা কেবল শিলচর শহরে সীমাবদ্ধ নয়, বরং গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকায়ও ছড়িয়ে রয়েছে। লালা টাউনের মতো এলাকায়ও অনুমোদনহীন চিকিৎসকদের কাছে যাওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে স্থানীয় বাসিন্দাদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য দপ্তর স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, এই মুহূর্তে অভিযোগগুলি প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং তদন্ত সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। তবে এই ঘটনা ভাগাবাজার এলাকায় ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি করেছে, বিশেষত যেসব পরিবার দীর্ঘদিন ধরে এই ক্লিনিকে চিকিৎসা করিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে। স্থানীয় প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ইনচার্জ চেরাব উদ্দিনের উপস্থিতি এই অভিযানে ইঙ্গিত দেয় যে জেলা স্বাস্থ্য প্রশাসন সরাসরি স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি বাড়াচ্ছে।
সামনে কী দেখার
কাছাড়ে ভুয়া ডাক্তারের ক্লিনিকে এই অভিযানের পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ভর করছে নথিপত্র যাচাইয়ের ফলাফলের ওপর। যদি অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে জাতীয় মেডিকেল কমিশন আইন এবং আসাম মেডিকেল কাউন্সিল আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় দারেন সিনহার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে, যেমনটা আগের একাধিক মামলায় দেখা গেছে। কাছাড় জেলা প্রশাসনের এই ধরনের নিয়মিত অভিযান বরাক উপত্যকার সাধারণ মানুষকে ভুয়া চিকিৎসকদের হাত থেকে রক্ষা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে একাধিক জেলায় বারবার এই ধরনের ঘটনা সামনে আসায় স্পষ্ট, শুধু অভিযান চালানোই যথেষ্ট নয় — জনসাধারণের সচেতনতা এবং চিকিৎসক নিয়োগের আগে যথাযথ যাচাইয়ের সংস্কৃতি গড়ে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। হাইলাকান্দি ও লালা টাউনের মতো এলাকার বাসিন্দাদের জন্য এই ঘটনা একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়—চিকিৎসকের যোগ্যতা ও রেজিস্ট্রেশন যাচাই করে নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।