বর্মী সুপারি অবৈধ বাণিজ্যের অভিযোগে বরাক উপত্যকায় একাধিক স্থানে তল্লাশি চালিয়েছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডি। ৫ আগস্ট ভোরবেলায় সংস্থাটি কাছাড় জেলায় পাঁচটি এবং হাইলাকান্দি জেলায় একটি মোট ছয়টি স্থানে সমান্তরাল অভিযান চালায়, যেখানে সন্দেহভাজন ব্যবসায়ীদের বাড়ি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো খতিয়ে দেখা হয় । এই পদক্ষেপটি মূলত কয়েক সপ্তাহ আগে শুরু হওয়া বড়সড় সুপারি পাচার ও অর্থ পাচার তদন্তের ধারাবাহিকতা বলে সূত্রের খবর ।
কী জানা গেছে এখনও পর্যন্ত
ইডি-র দলগুলো শিলচরের হাসপাতাল রোড এলাকায় দীপঙ্কর দে নামে এক ব্যক্তির সাথে যুক্ত ঠিকানা এবং লেদার ওয়্যারহাউস এলাকার সুপারি ব্যবসায়ী জাকির তালুকদারের সাথে সম্পর্কিত স্থানগুলোতে তল্লাশি চালায় । এর পাশাপাশি হাইলাকান্দি জেলায়ও অন্তত একটি স্থানে অভিযান চালানো হয়েছে, যদিও সেখানকার সুনির্দিষ্ট ঠিকানা বা নাম এখনও প্রকাশ্যে আসেনি । সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁরা অবৈধভাবে আমদানি করা বর্মী সুপারির ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এবং এর মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ বিভিন্ন উপায়ে বৈধ করার চেষ্টা করছেন।
এই নতুন অভিযানের পেছনে রয়েছে গত ৩ জুলাই আসাম, মিজোরাম, পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তরপ্রদেশে ২০টি স্থানে চালানো ইডি-র বড়সড় তল্লাশি, যেখানে সুপারি পাচার ও অর্থ পাচারের একটি সংগঠিত নেটওয়ার্কের কথা বলা হয়েছে । সূত্রের দাবি, সেই সময় শিলচরের ইটখোলা এলাকায় আবু মজুমদার নামে একজন সন্দেহভাজনের বাড়িতে তল্লাশির সময় একটি ডায়েরি উদ্ধার হয়, যেখানে এই ব্যবসার সাথে যুক্ত আরও অনেক নাম ও লেনদেনের বিবরণ ছিল বলে মনে করা হচ্ছে । সেই ভিত্তিতেই নতুন করে বরাক উপত্যকায় ছয়টি স্থানে অভিযান চালানো হয়েছে।
কেন এই তল্লাশি গুরুত্বপূর্ণ
বর্মী সুপারি বা বার্মিজ অ্যারেকা নাট ভারতে অবৈধভাবে ঢোকার বিষয়টি দীর্ঘদিনের। মিজোরামের চাম্ফাই ও জখাথার এলাকা দিয়ে তিয়াও নদী পার হয়ে শুকনো সুপারি ভারতে আনা হয়, তারপর তা আসাম ও বরাক উপত্যকার মধ্য দিয়ে দেশের বিভিন্ন বাজারে পাঠানো হয় । কাস্টমস শুল্ক এড়িয়ে এই পণ্য আমদানি করায় সরকারি রাজস্ব ক্ষতির পাশাপাশি স্থানীয় কৃষক ও বৈধ ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির শিকার হন। ডিআরআই ও ইডি-র মতে, এই পাচারের আকার এতটাই বড় যে এর থেকে প্রাপ্ত অর্থ প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে, যা বিভিন্ন রিয়েল এস্টেট ও অন্যান্য বিনিয়োগে ঢোকানো হয়েছে বলে অভিযোগ ।
এই প্রেক্ষাপটে বরাক উপত্যকায় ইডি-র তল্লাশি কেবল কয়েকটি দোকান বা গোডাউনের ওপর নয়, বরং পুরো পাচার নেটওয়ার্কের আর্থিক দিক খতিয়ে দেখার অংশ। যদি প্রমাণিত হয় যে স্থানীয় পর্যায়ে বড়সড় অর্থ লেনদেন হয়েছে, তবে পিএমএলএ-র অধীনে মামলা আরও গুরুতর রূপ নিতে পারে এবং সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণের মতো পদক্ষেপও নেওয়া হতে পারে ।
বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দির প্রেক্ষাপট
বরাক উপত্যকা—বিশেষ করে কাছাড়, হাইলাকান্দি ও করিমগঞ্জ—দীর্ঘদিন ধরেই বর্মী সুপারি পাচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে পরিচিত। ২০২২ সালে হাইলাকান্দির রামনাথপুর রেল স্টেশনে প্রায় ৪৬ টন বর্মী সুপারি জব্দ করা হয়েছিল, যার আনুমানিক মূল্য ছিল ২ কোটি টাকা । এর আগে ২০১৮ সালেও শিলচরে মিজোরাম থেকে আনা বর্মী সুপারিবোঝাই ট্রাক আটকানো হয় এবং চারজনকে গ্রেফতার করা হয় । অর্থাৎ, এই অঞ্চল দিয়ে পাচারের ইতিহাস বেশ পুরনো।
লালা টাউন ও আশপাশের এলাকার মানুষজনও প্রায়শই এই ধরনের খবরে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন, কারণ স্থানীয় কৃষক ও ছোট ব্যবসায়ীরা বৈধ সুপারি বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল। অবৈধ সুপারি বাজারে কম দামে এলে বৈধ ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়েন। তাই ইডি-র এই ধরনের তদন্ত স্থানীয় অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ, যদিও এর সরাসরি প্রভাব কতটা পড়বে তা এখনই বলা কঠিন।
সামনে কী দেখার আছে
এখন নজর থাকবে ইডি কী ধরনের তথ্য উদ্ধার করতে পারে এবং এই তল্লাশির পরে গ্রেফতার, জব্দ বা আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত কোনও আনুষ্ঠানিক বিবরণি আসে কি না। ইডি এখনও এই অভিযান নিয়ে কোনও সরকারি প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেয়নি, তাই বিস্তারিত তথ্যের জন্য অপেক্ষা করতে হবে । তবে গত কয়েক মাসে মিজোরাম ও আসামে ডিআরআই, কাস্টমস ও ইডি-র একাধিক যৌথ অভিযানের ধারাবাহিকতায় এই তল্লাশিকে দেখা হচ্ছে বড়সড় পাচার নেটওয়ার্ক ভাঙার আরেকটি পদক্ষেপ হিসেবে ।
বরাক উপত্যকার মানুষজন প্রত্যাশা করবেন, এই তদন্তের মাধ্যমে শুধু কয়েকটি দোকান নয়, বরং পুরো নেটওয়ার্কের মূল চক্রগুলো চিহ্নিত হবে। নইলে বর্মী সুপারি অবৈধ বাণিজ্যের মতো সমস্যা বারবার মাথাচাড়া দেবেই।