উজান অসমের প্রায় ১৮ হাজার বন্যাদুর্গত পরিবারের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য ভুল থাকায় সরাসরি ত্রাণের টাকা পাঠানো সম্ভব হয়নি। সমস্যার সমাধানে অসম সরকার এবার সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলিকে চেক বা ব্যাংক ড্রাফটের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা ভাবছে। অসম ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির ব্যাংক-সংক্রান্ত তথ্য সংশোধনের কাজ চললেও, দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দিতে বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে । ফলে বন্যা ত্রাণের টাকা আটকে থাকা পরিবারগুলির জন্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার বাইরে সরাসরি অর্থ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
কেন আটকে গেল ত্রাণের টাকা
অসম সরকার বন্যায় গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির ব্যাংক অ্যাকাউন্টে Direct Benefit Transfer বা DBT পদ্ধতিতে অর্থ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এই ব্যবস্থায় সুবিধাভোগীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর, IFSC কোড, ব্যাংকের নাম এবং অন্যান্য পরিচয়-সংক্রান্ত তথ্য সঠিক থাকা জরুরি। কিন্তু প্রায় ১৮ হাজার পরিবারের ক্ষেত্রে ওই তথ্যের মধ্যে ভুল বা অসামঞ্জস্য পাওয়া যাওয়ায় লেনদেন সম্পন্ন হয়নি ।
ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বন্ধ থাকা, ভুল অ্যাকাউন্ট নম্বর, নামের সঙ্গে অ্যাকাউন্টের তথ্য না মেলা, ভুল IFSC কোড অথবা অ্যাকাউন্ট অন্য ব্যক্তির নামে থাকার মতো কারণে সরকারি অর্থ ফেরত চলে যেতে পারে। এই ধরনের সমস্যার ফলে কাগজে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের নাম থাকলেও তাঁদের হাতে সময়মতো টাকা পৌঁছায় না। বন্যার পরে ঘর পরিষ্কার, বাসনপত্র কেনা, পোশাক সংগ্রহ ও জরুরি মেরামতির জন্য নগদ অর্থের প্রয়োজন থাকায় এই বিলম্ব পরিবারগুলির দুর্ভোগ আরও বাড়াতে পারে।
চেক বা ব্যাংক ড্রাফটে সহায়তার পরিকল্পনা
DBT-র মাধ্যমে টাকা পাঠাতে সমস্যা হওয়া পরিবারগুলির জন্য সরকার চেক বা ব্যাংক ড্রাফট দেওয়ার পরিকল্পনা করছে বলে জানা গেছে । এই পদ্ধতিতে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ডিজিটাল তথ্যের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করতে হবে না। তবে চেক বা ড্রাফট পাওয়ার পরও সুবিধাভোগীদের ব্যাংকে গিয়ে তা জমা দিতে হতে পারে। তাই অ্যাকাউন্ট সক্রিয় আছে কি না, নামের বানান ঠিক আছে কি না এবং প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্র মিলছে কি না—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
সরকারের সামনে এখন দুটি কাজ একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, যাঁদের তথ্য ভুল, তাঁদের সঠিক ব্যাংক বিবরণ সংগ্রহ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সংশোধনের অপেক্ষায় না রেখে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির কাছে দ্রুত বিকল্প পদ্ধতিতে সহায়তা পাঠাতে হবে। জেলা প্রশাসন, রাজস্ব দপ্তর এবং ব্যাংকগুলির সমন্বয় ছাড়া এই প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করা কঠিন হতে পারে।
ইতিমধ্যে কত পরিবার টাকা পেয়েছে
এই সমস্যার খবর এমন সময় সামনে এল, যখন অসম সরকার উজান অসমের চারটি জেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে অন্তর্বর্তী সহায়তা পাঠানো শুরু করেছে। শিবসাগর, চরাইদেও, গোলাঘাট ও যোরহাটের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে প্রথম ধাপে ১৫,০০০ টাকা করে দেওয়া হয়েছে। হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩ আগস্ট ৬২,৬৯৬টি পরিবারকে ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে অর্থ পাঠানো হয়; এর মধ্যে শিবসাগরের ৩৫,২৮৯, চরাইদেওর ১৯,৮৮৩, গোলাঘাটের ২,৫৯৩ এবং যোরহাটের ৪,৯২২টি পরিবার রয়েছে ।
নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, এই সহায়তা কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৭৫ হাজার পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে এবং মোট প্রায় ১৬০ কোটি টাকা ছাড়ার কথা বলা হয়েছে । প্রতিটি পরিবারের ১৫,০০০ টাকার প্যাকেজে পোশাকের জন্য ২,৫০০ টাকা, বাসনপত্রের জন্য ২,৫০০ টাকা, জীবিকা সহায়তার জন্য ৩,০০০ টাকা এবং রাজ্য সরকারের অতিরিক্ত ৭,০০০ টাকা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ।
বন্যা পরিস্থিতির বৃহত্তর প্রেক্ষাপট
এবারের বন্যায় উজান অসমের বহু গ্রাম দীর্ঘ সময় জলমগ্ন ছিল। কিছু এলাকায় রাস্তা ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় প্রশাসনের পক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির তালিকা তৈরি এবং ব্যাংক তথ্য যাচাই করাও কঠিন হয়ে পড়ে। অসমের বন্যায় এ বছর ছয় লক্ষেরও বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন বলে বিবিসির প্রতিবেদনে সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে জানানো হয়েছে । ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নেওয়া মানুষদের পাশাপাশি নিজেদের বাড়িতে ফিরে যাওয়া পরিবারগুলিরও নগদ সহায়তা প্রয়োজন হয়েছে।
আগেও অসমে সরকারি সহায়তা পাঠানোর সময় ব্যাংক তথ্যের ভুলের সমস্যা দেখা গেছে। ২০২২ সালের বন্যার পর প্রায় ১.৮৯ লক্ষ পরিবারকে সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও কয়েক হাজার পরিবারের ব্যাংক তথ্য প্রক্রিয়াধীন ছিল বলে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল । বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, DBT ব্যবস্থা স্বচ্ছতা বাড়ালেও তথ্য যাচাই ও সংশোধনের জন্য শক্তিশালী স্থানীয় সহায়তা ব্যবস্থা জরুরি।
হাইলাকান্দি ও লালা টাউনের জন্য বার্তা
বর্তমান ১৮ হাজার পরিবারের সমস্যাটি মূলত উজান অসমের বন্যাদুর্গত জেলাগুলিকে ঘিরে। তবে হাইলাকান্দি জেলা ও লালা টাউনের বাসিন্দাদের জন্যও এই ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। ভবিষ্যতে কোনও সরকারি ত্রাণ বা আর্থিক সহায়তার জন্য নাম নথিভুক্ত হলে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর, IFSC কোড, আধার-সংযুক্তি এবং সুবিধাভোগীর নামের বানান ভালোভাবে যাচাই করা দরকার। অ্যাকাউন্ট বন্ধ থাকলে বা অন্য কারও নামে থাকলে দ্রুত স্থানীয় প্রশাসন ও ব্যাংক শাখাকে জানানো উচিত।
বন্যা ত্রাণের টাকা আটকে থাকা পরিবারগুলির ক্ষেত্রে সরকার বিকল্প ব্যবস্থা নিলে অন্তত জরুরি সহায়তা দ্রুত পৌঁছতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিটি জেলার জন্য ব্যাংক তথ্য সংশোধন শিবির, গ্রামভিত্তিক যাচাই এবং সুবিধাভোগীদের অভিযোগ জানানোর নির্দিষ্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলাই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হবে। এখন নজর থাকবে, ১৮ হাজার পরিবারের হাতে চেক বা ব্যাংক ড্রাফট কবে পৌঁছায় এবং তাঁদের ব্যাংক তথ্য সংশোধনের কাজ কত দ্রুত শেষ হয়।