কাছাড় নিখোঁজ মহিলা উদ্ধারের ঘটনায় নতুন করে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে ধলাই বিধানসভা এলাকায়। প্রায় দু’দিন ধরে নিখোঁজ থাকার পর তপতী চক্রবর্তী নামে এক বিবাহিত মহিলার মৃতদেহ শনিবার সকালে পুনিখালি নালা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। নালাটি জীবনরাম গ্রাম পঞ্চায়েতের দেবীপুর পার্ট-২ এলাকার শ্মশান সংলগ্ন অঞ্চলে অবস্থিত। মৃতার স্বামী রবীন্দ্র চক্রবর্তী দেহটি শনাক্ত করেন। ঘটনার পর তিনি ধলাই থানায় দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করেছেন। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এখনও প্রমাণিত নয়; পুলিশ তদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও ঘটনাক্রম খতিয়ে দেখছে ।
কীভাবে নিখোঁজ হলেন তপতী
পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, ৬ আগস্ট রাতে তপতী স্বামী ও সন্তানের সঙ্গে বাড়িতে রাতের খাবার খান। এরপর তিনি ঘুমোতে যান। রবীন্দ্র চক্রবর্তীর দাবি, রাত প্রায় ১টার দিকে তাঁর ঘুম ভাঙলে তিনি দেখতে পান বাড়ির দরজা খোলা এবং তপতী ঘরে নেই। প্রথমে পরিবারের লোকজন নিজেদের উদ্যোগে আশপাশের এলাকা ও সম্ভাব্য জায়গাগুলিতে খোঁজ শুরু করেন। রাতভর অনুসন্ধান চালানোর পরও তাঁর সন্ধান মেলেনি।
পরদিনও পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দারা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ চালান। পরে রবীন্দ্র ধলাই থানায় নিখোঁজ সংক্রান্ত অভিযোগ দায়ের করেন। প্রায় দু’দিন ধরে তপতীর কোনও সন্ধান না পাওয়ায় পরিবারের উদ্বেগ বাড়তে থাকে। এই সময়ে তাঁর মোবাইল ফোন, চলাফেরার সম্ভাব্য পথ এবং পরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়গুলিও নজরে আসে বলে জানা গেছে ।
তবে পরিবারের তরফে আরও একটি বক্তব্য সামনে এসেছে। রবীন্দ্রের দাবি, ৬ আগস্ট তিনি কাজ থেকে বাড়ি ফেরার পর তপতী তাঁকে মাছ কিনতে বাজারে যাওয়ার কথা বলেছিলেন। এরপর রাতের কোনও এক সময় তিনি নিখোঁজ হন। তদন্তকারীরা এখন এই বক্তব্য, পরিবারের সদস্যদের বিবরণ এবং তপতীর শেষ অবস্থান—সবকিছু মিলিয়ে দেখছেন।
পুনিখালি নালায় দেহ উদ্ধারের পর তদন্ত
শনিবার সকালে স্থানীয় এক বাসিন্দা পুনিখালি নালায় একটি মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখেন বলে জানা গেছে। খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় মানুষজন জড়ো হন। পুলিশকে খবর দেওয়ার পর ধলাই থানার দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেহটি উদ্ধার করে। পরে পরিবারের সদস্যরা সেটি তপতী চক্রবর্তীর বলে শনাক্ত করেন ।
দেহটি ময়নাতদন্তের জন্য শিলচর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট থেকেই মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। দেহ উদ্ধারের পরিস্থিতি, আঘাতের কোনও চিহ্ন ছিল কি না এবং মৃত্যুর সময়—এসব বিষয় এখন তদন্তের কেন্দ্রে রয়েছে। পুলিশ এখনও মৃত্যুকে হত্যা, দুর্ঘটনা বা অন্য কোনও সম্ভাবনার মধ্যে নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করেনি।
এই ধরনের মামলায় ময়নাতদন্তের পাশাপাশি ঘটনাস্থলের ফরেনসিক পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। নালার অবস্থান, দেহ উদ্ধারের স্থান, তপতীর পোশাক ও ব্যক্তিগত সামগ্রী, এবং তাঁর মোবাইল ফোনের তথ্য তদন্তকারীদের ঘটনাক্রম বোঝাতে সাহায্য করতে পারে। পুলিশ শেষ ফোনকল, শেষ কথোপকথন এবং নিখোঁজ হওয়ার আগে তাঁর গতিবিধিও পরীক্ষা করছে ।
স্বামীর এফআইআরে দুই ব্যক্তির নাম
তপতীর স্বামী রবীন্দ্র চক্রবর্তী ধলাই থানায় দায়ের করা এফআইআরে দুই ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মধ্যে একজন ভুবনধর ফরেস্ট ভিলেজ এলপি স্কুলের প্রধান শিক্ষক মৃদুল কান্তি দাস বলে জানা গেছে। রবীন্দ্রের অভিযোগ, তপতীর মোবাইল ফোনে ওই দুই ব্যক্তির নম্বর ছিল এবং নিখোঁজ হওয়ার আগে তাঁদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা হয়েছিল ।
এই তথ্যের ভিত্তিতে রবীন্দ্র তাঁদের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু এফআইআরে নাম থাকা মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। পুলিশও বিষয়টি তদন্তাধীন বলে জানিয়েছে। দুই ব্যক্তির সঙ্গে তপতীর যোগাযোগের প্রকৃতি, কথোপকথনের সময়, নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর কল রেকর্ড ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণের পরই স্পষ্ট হতে পারে।
তদন্তকারীরা তপতীর মোবাইলের কল ডিটেল, শেষ অবস্থান, যোগাযোগের তালিকা এবং নিখোঁজ হওয়ার আগে তাঁর চলাফেরা যাচাই করছেন। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে। পুলিশ এখনও কাউকে দোষী ঘোষণা করেনি, তাই তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না ।
শিলচর ও বরাক উপত্যকার নিরাপত্তা প্রসঙ্গ
কাছাড় নিখোঁজ মহিলা উদ্ধারের ঘটনা শিলচর ও বরাক উপত্যকায় নারী নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কাছাড়ের গ্রামীণ এলাকায় নদী, নালা, জলাভূমি, চা-বাগান ও নির্জন রাস্তা রয়েছে—যেখানে নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধানে দ্রুত পুলিশি তৎপরতা ও স্থানীয় সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি। লালা টাউন ও হাইলাকান্দির বাসিন্দাদের জন্যও এই ঘটনা একটি সতর্কবার্তা। কেউ নিখোঁজ হলে দ্রুত থানায় অভিযোগ করা, মোবাইলের শেষ অবস্থান সংরক্ষণ করা এবং পরিবারের সদস্যদের মধ্যে তথ্য ভাগ করে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের উচিত গুজব ছড়ানোর বদলে পুলিশকে নির্ভরযোগ্য তথ্য দেওয়া। একইসঙ্গে পরিবারগুলির অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে নথিভুক্ত করা এবং তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য জানানো প্রশাসনের দায়িত্ব। তপতী চক্রবর্তীর ক্ষেত্রে এফআইআরে নাম থাকা দুই ব্যক্তির ভূমিকা তদন্তে কীভাবে উঠে আসে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ময়নাতদন্তের রিপোর্টের অপেক্ষা
তপতীর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনও নিশ্চিত নয়। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট, ফরেনসিক তথ্য, কল রেকর্ড এবং ঘটনাস্থলের প্রমাণ একত্রে বিশ্লেষণ করার পরই মামলাটি কোন দিকে এগোবে তা পরিষ্কার হবে। পুলিশ যদি অপরাধের প্রমাণ পায়, তবে সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা আরও শক্তিশালী হতে পারে; আবার অন্য কোনও কারণ সামনে এলে তদন্ত সেই অনুযায়ী এগোবে।
এই মুহূর্তে পরিবারের জন্য দ্রুত সত্য উদ্ঘাটনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কাছাড় নিখোঁজ মহিলা উদ্ধারের ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণভিত্তিক পদক্ষেপ এবং আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়াই তপতী চক্রবর্তীর মৃত্যুর রহস্য সমাধানের একমাত্র পথ। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট ও পুলিশের পরবর্তী বিবৃতির দিকেই এখন নজর থাকবে ।