হাইলাকান্দির তরুণ তায়কোয়ানডো খেলোয়াড় হামিদা নূর লাস্কর থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক তায়কোয়ানডো চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা জিতে জেলার ক্রীড়াক্ষেত্রে নতুন সাফল্য এনে দিয়েছেন। উত্তর নারায়ণপুরের ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা হামিদা প্রতিযোগিতায় নিজের দক্ষতা ও দৃঢ়তা দেখিয়ে শীর্ষস্থান অর্জন করেন। তাঁর এই সাফল্যে হাইলাকান্দি, বরাক উপত্যকা এবং অসমের ক্রীড়ামহলে আনন্দের আবহ তৈরি হয়েছে ।
থাইল্যান্ডের পাটায়ায় ৩১ জুলাই থেকে ২ আগস্ট পর্যন্ত অনুষ্ঠিত নবম হিরোজ ইন্টারন্যাশনাল তায়কোয়ানডো চ্যাম্পিয়নশিপে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিযোগীরা অংশ নেন। অসম থেকে অংশ নেওয়া খেলোয়াড়দের দলও উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যের ৪০ সদস্যের ভারতীয় দল মোট ৩৫টি পদক জিতেছে—এর মধ্যে সাতটি সোনা, ১৩টি রুপো এবং ১৫টি ব্রোঞ্জ । সেই পদকজয়ী খেলোয়াড়দের মধ্যে হামিদা নূর লাস্করের সোনা বিশেষভাবে হাইলাকান্দির নাম সামনে এনেছে।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে হামিদার সাফল্য
হামিদার সোনা জয় শুধু একটি পদক পাওয়ার ঘটনা নয়; এটি স্থানীয় স্তর থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে উঠে আসার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। হাইলাকান্দির মতো জেলার কোনও তরুণ খেলোয়াড় যখন বিদেশের প্রতিযোগিতায় সাফল্য অর্জন করেন, তখন তা স্থানীয় ক্রীড়াবিদদের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে। জেলার ক্রীড়াক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ, নিয়মিত অনুশীলন এবং প্রতিযোগিতামূলক অভিজ্ঞতার গুরুত্বও এই সাফল্যের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়।
আন্তর্জাতিক তায়কোয়ানডো প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে খেলোয়াড়দের শারীরিক সক্ষমতার পাশাপাশি কৌশল, গতি, ভারসাম্য ও মানসিক প্রস্তুতিরও প্রয়োজন হয়। প্রতিপক্ষের আক্রমণ বুঝে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানো, নির্ধারিত নিয়ম মেনে পয়েন্ট সংগ্রহ করা এবং চাপের মধ্যে স্থির থাকা—প্রতিটি পর্যায়েই দক্ষতা দরকার। হামিদার সাফল্য ইঙ্গিত করছে, তিনি এই প্রস্তুতির যথেষ্ট প্রমাণ দিয়েছেন।
তবে হামিদার ব্যক্তিগত প্রশিক্ষণ, কোচ, প্রতিযোগিতার বিভাগ এবং ফাইনালের নির্দিষ্ট ফলাফল সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। তাই তাঁর সাফল্যকে ঘিরে উৎসাহ থাকলেও, যাচাই না হওয়া অতিরিক্ত তথ্য প্রচার না করাই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার অংশ।
অসমের দলগত সাফল্য
থাইল্যান্ডের এই প্রতিযোগিতায় অসমের খেলোয়াড়দের সামগ্রিক ফলও উল্লেখযোগ্য। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দলটি ৩৫টি পদক জিতেছে। সাতটি সোনা, ১৩টি রুপো এবং ১৫টি ব্রোঞ্জের এই পদকতালিকা রাজ্যের তায়কোয়ানডো প্রতিভার বিস্তারকে তুলে ধরে । হামিদার সোনা সেই দলগত সাফল্যেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এর আগে অসমের খেলোয়াড়েরা আন্তর্জাতিক তায়কোয়ানডো প্রতিযোগিতায় একাধিক পদক জিতেছেন। ২০২৫ সালে কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত দ্বাদশ স্পিড পাওয়ার ইন্টারন্যাশনাল তায়কোয়ানডো চ্যাম্পিয়নশিপে অসমের খেলোয়াড়েরা তিনটি রুপো ও দুটি ব্রোঞ্জসহ মোট পাঁচটি পদক পেয়েছিলেন । এই ধারাবাহিকতা দেখায়, রাজ্যে তায়কোয়ানডো ধীরে ধীরে আরও বেশি জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।
অসমের ১৬ জন খেলোয়াড় ২০২৬ সালের বিশ্ব তায়কোয়ানডো পুমসে চ্যাম্পিয়নশিপে ভারতের প্রতিনিধিত্বের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন বলেও সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার চুনচিয়নে ১৬ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর প্রতিযোগিতাটি হওয়ার কথা । ফলে আন্তর্জাতিক স্তরে রাজ্যের খেলোয়াড়দের উপস্থিতি আরও বাড়ছে।
হাইলাকান্দির ক্রীড়াক্ষেত্রে নতুন অনুপ্রেরণা
হামিদা নূর লাস্করের সাফল্য হাইলাকান্দির তরুণদের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। জেলার বহু শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলায় আগ্রহী হলেও প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম, যাতায়াত ও প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের খরচ তাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আন্তর্জাতিক পদকজয়ী একজন স্থানীয় খেলোয়াড়ের উদাহরণ সেই বাধা অতিক্রমের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পারে।
হাইলাকান্দি ও লালা টাউনের স্কুল, ক্লাব এবং ক্রীড়া সংগঠনগুলি এই সাফল্যকে কাজে লাগিয়ে তায়কোয়ানডো প্রশিক্ষণ শিবির আয়োজন করতে পারে। বিশেষ করে কিশোরী ও তরুণীদের আত্মরক্ষা, শারীরিক ফিটনেস এবং প্রতিযোগিতামূলক খেলায় যুক্ত করার ক্ষেত্রে মার্শাল আর্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে প্রশিক্ষণ যেন স্বীকৃত কোচের অধীনে এবং নিরাপদ পরিবেশে হয়, সেদিকেও নজর রাখা জরুরি।
স্থানীয় প্রশাসন, ক্রীড়া দপ্তর ও সমাজের বিত্তবান মানুষরা যদি প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের যাতায়াত, প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জামের ক্ষেত্রে সহায়তা করেন, তাহলে আরও অনেক হামিদা আন্তর্জাতিক মঞ্চে উঠতে পারেন। একটি পদক অনেক সময় একটি জেলার ক্রীড়া সংস্কৃতিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের সূচনা করে।
সামনে আরও সুযোগের অপেক্ষা
হামিদার এই সাফল্যের পরে তাঁর পরবর্তী প্রতিযোগিতা, প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা এবং সরকারি বা ক্রীড়া সংস্থার স্বীকৃতি নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি সোনা খেলোয়াড়ের আত্মবিশ্বাস বাড়ালেও ধারাবাহিক পারফরম্যান্স ধরে রাখতে নিয়মিত অনুশীলন ও উন্নত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। অসমের দলগত ফলও দেখাচ্ছে, রাজ্যের খেলোয়াড়দের জন্য আরও বড় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার দরজা খুলছে।
হামিদা নূর লাস্কর সোনা জিতে হাইলাকান্দির নাম আন্তর্জাতিক ক্রীড়ামঞ্চে তুলে ধরেছেন। এখন এই সাফল্যকে স্মরণীয় করে রাখার পাশাপাশি জেলার নতুন খেলোয়াড়দের জন্য প্রশিক্ষণ ও সুযোগ তৈরির দায়িত্বও সমাজ ও প্রশাসনের। তাঁর পদক যদি লালা টাউন ও হাইলাকান্দির আরও তরুণকে খেলাধুলায় এগিয়ে আসতে উৎসাহিত করে, তাহলেই এই জয়ের প্রভাব আরও গভীর হবে।