হিমন্ত বিশ্বশর্মাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে আবারও, মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে এটি দ্বিতীয় ঘটনা। অসমের মুখ্যমন্ত্রী সামাজিক মাধ্যমে এক ব্যক্তির কাছ থেকে এই হুমকি পেয়েছেন, যেখানে অভিযুক্ত ২ কোটি টাকার বিনিময়ে তাকে হত্যা করার প্রস্তাব দিয়েছেন। মুবারক আলী নামে একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করা এই হুমকিতে দাবি করা হয়েছে যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নগাঁও জেলার জুরিয়ার গদাইমারি এলাকার বাসিন্দা। পোস্টটিতে “পাকিস্তান জিন্দাবাদ” ও “হিন্দুস্তান মুর্দাবাদ” স্লোগানও উল্লেখ ছিল ।
অসম পুলিশ এই হুমকির বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে এবং শীঘ্রই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে হেফাজতে নেওয়া হবে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে । এই সর্বশেষ হুমকিটি এসেছে আরেকটি ঘটনার মাত্র তিন দিন পর, যেখানে মরিগাঁও জেলার বাসিন্দা আব্দুল মোতালেব নামে এক ব্যক্তিকে একই ধরনের হুমকি দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
স্বাধীনতা দিবসের লাইভ সম্প্রচারে প্রথম হুমকি
শনিবার, স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রীর ভাষণের লাইভ স্ট্রিমিং চলাকালীন আব্দুল মোতালেব নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে একটি মন্তব্য পোস্ট করা হয়, যেখানে ১ কোটি টাকার বিনিময়ে মুখ্যমন্ত্রীকে হত্যা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এই মন্তব্যের সঙ্গে একটি ফোন নম্বরও দেওয়া হয়েছিল এবং তাতে পাকিস্তানপন্থী স্লোগানও যুক্ত ছিল বলে জানা গেছে ।
মরিগাঁও পুলিশ দ্রুত তদন্ত চালিয়ে বুরাগাঁও এলাকা থেকে মোতালেবকে গ্রেপ্তার করে। মরিগাঁওয়ের এসএসপি নিশান্ত সৌরভ জানান, ফেসবুক লাইভ সম্প্রচারের মন্তব্য বিভাগে এই হুমকি পোস্ট করা হয়েছিল । মোতালেবের বাবা আব্দুল খালেক, ভাই আবু তালেব এবং একই এলাকার রশিদুল ইসলাম নামে আরেকজনকেও এই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল ।
অভিযুক্তের দাবি ও পুলিশের অবস্থান
দর্জির কাজ করা মোতালেব অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “এটা মিথ্যা। যে আসলে এই কাজ করেছে তাকে খুঁজে বের করে গ্রেপ্তার করা উচিত। আমি হুমকি দিইনি। কেউ আমার নাম ও ছবি ব্যবহার করে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে এই পোস্ট করেছে। এটা আমার অ্যাকাউন্ট নয়” । তবে পুলিশ জানিয়েছে, হুমকিতে ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরটি মোতালেবের নামেই নথিভুক্ত ছিল, যার ভিত্তিতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ।
রবিবার আদালতে হাজির করার পর মোতালেবকে পাঁচ দিনের পুলিশি হেফাজতে পাঠানো হয়। তদন্তকারীরা এখন যাচাই করছেন যে ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি সত্যিই মোতালেবের কিনা এবং প্রকৃতপক্ষে কে এই হুমকিমূলক মন্তব্য পোস্ট করেছিল ।
মুখ্যমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া
সাম্প্রতিক এই হুমকির প্রতিক্রিয়ায় ডঃ হিমন্ত বিশ্বশর্মা বলেন, তিনি অতীতেও তার জীবনের প্রতি হুমকি সম্পর্কে সতর্কবার্তা পেয়েছেন। তিনি বলেন, “আশীর্বাদ যাত্রার সময়ও একটি সতর্কবার্তা ছিল। দিল্লি থেকে গোয়েন্দা সতর্কবার্তা এসেছিল যে আমার জীবনের প্রতি তীব্র হুমকি রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, সেই সময় আইবি আমাদের আশীর্বাদ যাত্রা বন্ধ করতে বলেছিল” ।
মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, এই ধরনের হুমকি তার কাছে নতুন কিছু নয় এবং কিছু মানুষ তার প্রতি অসন্তুষ্ট। তিনি বলেন, “তাই আমি মনে করি এটা নতুন কোনো বিষয় নয়। কিছু মানুষ আমার ওপর সন্তুষ্ট নন। তাই স্বাভাবিকভাবেই আমার প্রতি কিছু ধরনের হুমকি থাকে। কিন্তু এটা ঠিক আছে। আমাদের পুলিশ আমাকে নিরাপত্তা দেওয়ার সক্ষমতা রাখে। তাই আমি এই বিষয়ে চিন্তিত নই” ।
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপট
মুখ্যমন্ত্রীর প্রতি এই ধরনের ধারাবাহিক হুমকি রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে দুটি পৃথক ঘটনায় পাকিস্তানপন্থী স্লোগান যুক্ত থাকার বিষয়টি তদন্তকারীদের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ এটি সাধারণ ব্যক্তিগত শত্রুতার চেয়ে বেশি কিছু ইঙ্গিত করতে পারে। অসম পুলিশ উভয় ঘটনাতেই দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে এবং সামাজিক মাধ্যম পর্যবেক্ষণ আরও জোরদার করেছে।
রাজ্যের শীর্ষ প্রশাসনিক পদে থাকা ব্যক্তির নিরাপত্তা সংক্রান্ত এই ধরনের ঘটনা সামগ্রিকভাবে রাজ্যের সাইবার নিরাপত্তা ও সামাজিক মাধ্যম নজরদারি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে, ভবিষ্যতে এই ধরনের হুমকি প্রতিরোধে সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে সমন্বয় আরও বাড়ানো হবে।
বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দির প্রেক্ষাপট
যদিও এই ঘটনাগুলো মূলত নগাঁও ও মরিগাঁও জেলাকেন্দ্রিক, তবে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তা সংক্রান্ত যেকোনো বিষয় বরাক উপত্যকাসহ সমগ্র অসমের বাসিন্দাদের কাছেই উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। হাইলাকান্দি ও লালা টাউনের বাসিন্দারাও রাজ্যের শীর্ষ নেতৃত্বের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে সচেতন এবং এই ধরনের ঘটনায় প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, সামাজিক মাধ্যমে যেকোনো ধরনের উস্কানিমূলক বা হুমকিমূলক বার্তা পোস্ট করার প্রবণতা রোধে সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনা এড়ানো যায় এবং রাজ্যের সামাজিক সম্প্রীতি বজায় থাকে।
ভবিষ্যতে কী পদক্ষেপ প্রত্যাশিত
পুলিশ উভয় ঘটনারই পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায়। মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ প্রশাসন ইতিমধ্যেই সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।
আগামী দিনে এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে আরও কার্যকর সমন্বয় এবং দ্রুত তদন্ত প্রক্রিয়া গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্রিয়তা এই ধরনের হুমকির বিরুদ্ধে জনগণের আস্থা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।