শ্রীভূমি রাবার ব্যবসায় জিএসটি অভিযান চালিয়েছে অসম রাজ্য কর দপ্তরের গোয়েন্দা ও প্রয়োগ শাখা, রবিবার, ২৩ আগস্ট রাতাবাড়ি ও পাথারকান্দি এলাকার পাঁচটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে। কাঁচা রাবার ব্যবসায় কর ফাঁকির অভিযোগে চালানো এই অভিযানে ভুয়া ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট (আইটিসি) ব্যবহার করে জিএসটি দায় মেটানোর সন্দেহে আর্থিক নথি ও লেনদেনের বিবরণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে ।
রাজ্য কর দপ্তরের সুপারিনটেনডেন্ট মনুজ কুমার দোওয়ারির নেতৃত্বে পরিচালিত এই অভিযানে অসম পুলিশও সহযোগিতা করেছে। তল্লাশি চালানো পাঁচটি প্রতিষ্ঠান হলো—সাব্বির আহমেদের কাজিরবাজার রাবার এন্টারপ্রাইজ, শামীম আহমেদের সেফওয়ে সলিউশনস, দিলরুবা বেগমের উজালা ট্রেডার্স, ফয়েজ আহমেদের ইউনাইটেড কমার্শিয়াল এবং আবু তাহিরের টি অ্যান্ড টি ট্রেডিং অ্যান্ড কোম্পানি ।
কী কারণে এই অভিযান
শ্রীভূমি জেলা অসমের অন্যতম প্রধান রাবার উৎপাদনকারী অঞ্চল, যেখান থেকে বিপুল পরিমাণ কাঁচা রাবার দেশের অন্যান্য রাজ্যের বাজারে পাঠানো হয়। তদন্তকারীরা যাচাই করে দেখছেন, জিএসটি রিপোর্টিংয়ে অনিয়ম এবং ভুয়া আইটিসি দাবির মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে কিনা। কর্মকর্তাদের মতে, লেনদেনের মোট মূল্য, অবৈধভাবে দাবি করা আইটিসির পরিমাণ এবং সম্ভাব্য কর দায় নির্ধারণের জন্য নথিপত্র বিশ্লেষণ চলছে ।
এই ধরনের অভিযান অসমে নতুন নয়। গত জুলাই মাসে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, রাজ্য জিএসটি কর্মকর্তারা গত এক বছরে সারা অসম জুড়ে ৩৫২টি ভুয়া নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করেছিলেন, যেগুলো প্রায় ১,৪০০ কোটি টাকার ভুয়া ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট দাবির সঙ্গে যুক্ত ছিল। এর মধ্যে প্রায় ১,২০০ কোটি টাকা অন্য রাজ্যে স্থানান্তরিত হয়েছিল বলে জানা যায়। রাজ্যজুড়ে ৪৩টি তল্লাশি ও জব্দ অভিযানে প্রায় ৩৩.৩৪ কোটি টাকার কর ফাঁকি উদ্ঘাটিত হয়েছিল, যার মধ্যে ৫.৩৪ কোটি টাকা ইতিমধ্যে আদায় করা হয়েছে এবং নয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল ।
সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বৃদ্ধি
কর ফাঁকি রোধে রাজ্য সরকার শ্রীরামপুর ও বকশিরহাটের মতো আন্তঃরাজ্য সীমান্ত পয়েন্টগুলোতে নজরদারি চৌকি স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছিল। এই উদ্যোগের ফলে গত এক মাসে ওই পয়েন্টগুলো থেকে খেলাপিদের কাছ থেকে প্রায় ৯০ লাখ টাকা আদায় করা সম্ভব হয়েছিল, এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র ছাড়া রেলপথে আসা পণ্যবাহী ৮৩টি যানবাহনও আটক করা হয়েছিল, যেখান থেকে প্রায় ৪১ লাখ টাকা কর আদায় হয় । শ্রীভূমিতে সাম্প্রতিক অভিযান এই বৃহত্তর রাজ্যব্যাপী নজরদারি অভিযানেরই একটি সম্প্রসারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
রাবার ব্যবসায় কর ফাঁকির অভিযোগ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, বরাক উপত্যকার অর্থনীতিতে রাবার শিল্পের একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। এই অঞ্চলে ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা প্রায়শই রাবার সংগ্রহ করে অন্য রাজ্যে সরবরাহ করেন, এবং এই সরবরাহ শৃঙ্খলে কর সংক্রান্ত অনিয়ম ধরা পড়লে তা সমগ্র শিল্পের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
শ্রীভূমি জেলা ও এর প্রেক্ষাপট
উল্লেখ্য, বর্তমান শ্রীভূমি জেলা পূর্বে করিমগঞ্জ নামে পরিচিত ছিল। ২০২৪ সালের ১৯ নভেম্বর অসম মন্ত্রিসভা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বর্ণনা অনুসরণ করে জেলাটির নাম পরিবর্তন করে শ্রীভূমি রাখে। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা তখন জানিয়েছিলেন, “একশো বছরেরও বেশি আগে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আধুনিক করিমগঞ্জ জেলাকে ‘শ্রীভূমি’—মা লক্ষ্মীর ভূমি বলে বর্ণনা করেছিলেন। আজ অসম মন্ত্রিসভা আমাদের জনগণের দীর্ঘদিনের এই দাবি পূরণ করেছে” ।
বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী বরাক উপত্যকার এই জেলা রাতাবাড়ি, পাথারকান্দি, করিমগঞ্জ উত্তর, করিমগঞ্জ দক্ষিণ ও বদরপুর—এই পাঁচটি বিধানসভা কেন্দ্র নিয়ে গঠিত এবং হাইলাকান্দির সঙ্গে করিমগঞ্জ লোকসভা কেন্দ্র ভাগ করে নেয় 1122। এই ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণেই শ্রীভূমিতে ঘটা যেকোনো অর্থনৈতিক ঘটনা হাইলাকান্দি জেলার ব্যবসায়ী মহলেও প্রভাব ফেলে।
হাইলাকান্দি ও লালা টাউনের জন্য গুরুত্ব
শ্রীভূমি ও হাইলাকান্দি—দুই প্রতিবেশী জেলাই বরাক উপত্যকার অংশ এবং একই ধরনের কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্পভিত্তিক অর্থনীতি ভাগ করে নেয়। রাতাবাড়ি ও পাথারকান্দিতে চলা রাবার ব্যবসার সঙ্গে হাইলাকান্দি ও লালা টাউনের অনেক ব্যবসায়ীরও লেনদেনের সম্পর্ক রয়েছে, কারণ কাঁচামাল সংগ্রহ ও পরিবহনে দুই জেলার বাজার প্রায়শই একে অপরের ওপর নির্ভরশীল।
এই অভিযান স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে—জিএসটি নিয়মকানুন মেনে চলা এবং সঠিক নথিপত্র বজায় রাখা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি। হাইলাকান্দির ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদেরও উচিত তাদের আইটিসি দাবি ও কর রিটার্ন নিয়মিত যাচাই করা, যাতে ভবিষ্যতে এই ধরনের তদন্তের মুখোমুখি হতে না হয়।
তদন্তের পরবর্তী পদক্ষেপ
কর দপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে জব্দ করা নথিপত্র এবং অনুমিত কর ফাঁকির পরিমাণ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হবে। এখন পর্যন্ত পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি হলেও, প্রকৃত কর ফাঁকির পরিমাণ নিশ্চিত হতে আরও সময় লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আগামী দিনগুলোতে এই তদন্তের ফলাফল কেবল শ্রীভূমির নয়, গোটা বরাক উপত্যকার রাবার ব্যবসায়ীদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, কারণ এটি প্রমাণ করবে যে রাজ্য সরকার কর ফাঁকি রোধে কতটা কঠোর অবস্থান নিচ্ছে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর উচিত এই বিষয়ে সদস্যদের সচেতন করা এবং নিয়মিত কর অনুপালন নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।