বিশাল গোসাপ উদ্ধার করা হয়েছে কাছাড় জেলার সিদ্ধেশ্বর পার্ট-২ গ্রামের একটি বাড়ি থেকে, রবিবার, ২৩ আগস্ট সকালে। বাড়ির খাটের নিচে লুকিয়ে থাকা এই বিশালাকার বেঙ্গল মনিটর লিজার্ডকে ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে, এবং ঘটনাটি আরও উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠে এই কারণে যে, মাত্র ২৩ দিনের মধ্যে একই এলাকা থেকে এটি দ্বিতীয়বার এই ধরনের সরীসৃপ উদ্ধারের ঘটনা ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গীতু মালাকারের পরিবারের সদস্যরা বাড়ির ভেতর থেকে অস্বাভাবিক শব্দ শুনতে পেয়ে স্থানীয় প্রশাসনকে খবর দেন। বিষয়টি গ্রাম পঞ্চায়েতের সভাপতি রিপন রায়ের নজরে আনা হলে তিনি দ্রুত বন দপ্তরে যোগাযোগ করেন। খবর পেয়ে বন দপ্তরের শিয়ালটেক বিট অফিসের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে সরীসৃপটিকে নিরাপদে উদ্ধারের অভিযান শুরু করে ।
উদ্ধার অভিযানের বিস্তারিত
দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর সহকারী বিট অফিসার সাধন দাসের নেতৃত্বে বন কর্মীরা কোনো ক্ষতি না করে সফলভাবে গোসাপটিকে উদ্ধার করেন। এই ধরনের উদ্ধার অভিযান সাধারণত জটিল হয়ে থাকে, কারণ বেঙ্গল মনিটর লিজার্ড আকারে বড় এবং আতঙ্কিত অবস্থায় আক্রমণাত্মক আচরণ করতে পারে। তবে প্রশিক্ষিত বন কর্মীরা ধৈর্য সহকারে প্রাণীটিকে কোনো আঘাত ছাড়াই ধরে ফেলতে সক্ষম হন ।
একই এলাকা থেকে ২৩ দিনের ব্যবধানে দ্বিতীয়বার এই ধরনের উদ্ধার ঘটনা ঘটায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে কৌতূহলের পাশাপাশি উদ্বেগও তৈরি হয়েছে, বিশেষত যারা এমন এলাকার কাছাকাছি বসবাস করেন যেখানে এই ধরনের বন্যপ্রাণীর উপস্থিতি সম্ভব। বন বিভাগের কর্মকর্তারা এই পুনরাবৃত্তিকে গুরুত্ব সহকারে দেখছেন এবং এলাকাটিতে নজরদারি বাড়ানোর কথা বিবেচনা করছেন।
বেঙ্গল মনিটর লিজার্ড সম্পর্কে জানা জরুরি
বেঙ্গল মনিটর লিজার্ড বা গোসাপ ভারতীয় উপমহাদেশে সবচেয়ে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত মনিটর লিজার্ড প্রজাতিগুলোর একটি, যা ইরান থেকে জাভা পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে পাওয়া যায়। এই প্রজাতি ভারতের বন্যপ্রাণী সুরক্ষা আইন, ১৯৭২-এর তফসিল-১ এর অন্তর্ভুক্ত, যার অর্থ এটি সর্বোচ্চ স্তরের আইনি সুরক্ষা পায় এবং এই প্রাণীর ক্ষতি করা বা হত্যা করা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ । আন্তর্জাতিকভাবে এটি সাইটিস (CITES) চুক্তির অ্যাপেন্ডিক্স-১-এ তালিকাভুক্ত, অর্থাৎ এই প্রজাতির বাণিজ্যিক ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ।
আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ ইউনিয়নের (আইইউসিএন) সবশেষ মূল্যায়ন অনুযায়ী, বেঙ্গল মনিটর লিজার্ডকে “নিয়ার থ্রেটেন্ড” বা প্রায়-বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যদিও এই প্রজাতির বিস্তৃত ভৌগোলিক উপস্থিতির কারণে একে এখনও সম্পূর্ণভাবে বিপন্ন ঘোষণা করা হয়নি, তবে চামড়া ও মাংসের জন্য শিকার এবং কৃষিজমিতে কীটনাশকের ব্যবহারের কারণে খাদ্যের অভাবে এর সংখ্যা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে । নগরায়ণ ও বসতি সম্প্রসারণের ফলে এই প্রাণীগুলো ক্রমশ মানুষের বসতির কাছাকাছি চলে আসছে, যার ফলে এই ধরনের গৃহস্থালিতে উপস্থিতির ঘটনা বেড়েই চলেছে বলে গবেষকরা মনে করেন ।
কাছাড়ে বন্যপ্রাণী উদ্ধারের প্রবণতা
কাছাড় জেলা, যা বরাক উপত্যকার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন বন্যপ্রাণী উদ্ধারের ঘটনার সাক্ষী থেকেছে। এর আগে ২০২২ সালে সিলচরের বিনোদ নগর এলাকা থেকে ৯ ফুট দীর্ঘ একটি কিং কোবরা উদ্ধার করা হয়েছিল, যেখানে তরুণ হার্পেটোলজিস্ট ত্রিকাল চক্রবর্তী সরীসৃপটিকে নিরাপদে উদ্ধার করেছিলেন। তিনি তখন স্থানীয় বাসিন্দাদের সচেতন করে বলেছিলেন যে কিং কোবরাও বন্যপ্রাণী সুরক্ষা আইনের তফসিল-১-এর অন্তর্ভুক্ত এবং একে হত্যার চেষ্টা আইনি শাস্তির কারণ হতে পারে ।
কাছাড়ের মতো এলাকায় জনবসতি সম্প্রসারণ এবং বনভূমি সংকোচনের ফলে সাপ, গোসাপসহ বিভিন্ন সরীসৃপ প্রায়ই মানুষের বাড়িতে ঢুকে পড়ার ঘটনা ঘটছে। বন বিভাগের বিট অফিসগুলো এই ধরনের পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার চেষ্টা করে, তবে স্থানীয় জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধিও সমান গুরুত্বপূর্ণ, যাতে আতঙ্কে বন্যপ্রাণী হত্যার ঘটনা এড়ানো যায়।
হাইলাকান্দি ও লালা টাউনের জন্য প্রাসঙ্গিকতা
কাছাড় জেলা হাইলাকান্দির অত্যন্ত নিকটবর্তী প্রতিবেশী এবং একই বরাক উপত্যকা অঞ্চলের অংশ, যেখানে একই ধরনের ভূপ্রকৃতি, জলাভূমি ও কৃষিজমি বিদ্যমান। এই কারণে লালা টাউন ও হাইলাকান্দির গ্রামীণ এলাকাগুলোতেও গোসাপ বা অন্যান্য সরীসৃপ বাড়িতে ঢুকে পড়ার ঘটনা ঘটতে পারে, বিশেষত বর্ষার মরশুমে যখন এই প্রাণীরা খাদ্য ও আশ্রয়ের সন্ধানে জলাভূমি থেকে সরে আসে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য এই ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে—বাড়িতে অপরিচিত সরীসৃপ দেখা গেলে আতঙ্কিত হয়ে নিজে থেকে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে অবিলম্বে নিকটবর্তী বন দপ্তর বা বন্যপ্রাণী উদ্ধার দলের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। হাইলাকান্দি জেলা প্রশাসনও এই ধরনের ঘটনার জন্য একটি সহজলভ্য হেল্পলাইন নম্বর গ্রামবাসীদের মধ্যে প্রচার করতে পারে, যাতে ভবিষ্যতে দ্রুত ও নিরাপদ উদ্ধার সম্ভব হয়।
ভবিষ্যতে কী করণীয়
একই গ্রাম থেকে অল্প সময়ের ব্যবধানে দুইবার গোসাপ উদ্ধারের ঘটনা প্রমাণ করে যে সিদ্ধেশ্বর পার্ট-২ ও তার আশপাশের এলাকায় এই প্রজাতির উপস্থিতি নিয়মিত হয়ে উঠছে। বন বিভাগের উচিত এলাকাটিতে সমীক্ষা চালিয়ে দেখা, কাছাকাছি কোনো প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস হয়েছে কিনা যার ফলে এই প্রাণীরা জনবসতিতে ঢুকে পড়তে বাধ্য হচ্ছে।
আগামী দিনগুলোতে বন বিভাগ যদি স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালায় এবং দ্রুত উদ্ধার ব্যবস্থা আরও সহজলভ্য করে, তাহলে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর মধ্যে সংঘাত এড়ানো সম্ভব হবে। ততদিন পর্যন্ত বরাক উপত্যকার বাসিন্দাদের জন্য বার্তা স্পষ্ট—বন্যপ্রাণীর সঙ্গে সহাবস্থান শিখতে হবে, কারণ এই প্রাণীরাও আমাদের পরিবেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ।