হাফলং শিলচর এলিভেটেড করিডোর সোমবার, ২৪ আগস্ট থেকে যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে, যা নির্ধারিত সময়সূচির অনেক আগেই সম্পন্ন হয়েছে। শিলচর-সৌরাষ্ট্র ইস্ট-ওয়েস্ট করিডোরের হাফলং-শিলচর অংশে ডলাইছংগা এলাকায় নবনির্মিত এই এলিভেটেড সড়কের দুটি লেন চালু হওয়ায় দীর্ঘদিনের যানজট থেকে মুক্তি পেয়েছেন নিত্যযাত্রীরা ।
জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ডলাইছংগা এলিভেটেড করিডোরের কাজ প্রাথমিকভাবে ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত ছিল। তবে প্রথম দুটি লেন ২৪ আগস্ট, নির্ধারিত সময়ের প্রায় চার সপ্তাহ আগেই যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। বাকি দুটি লেন আগামী ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে চালু হবে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে ।
দীর্ঘদিনের যানজটের কারণ ও প্রভাব
পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, চলমান নির্মাণকাজ এবং যান চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে ডলাইছংগা এলাকা দীর্ঘদিন ধরে হাফলং-শিলচর রুটের একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বিশেষ করে ব্যস্ত সময়ে যাত্রীবাহী বাস, পণ্যবাহী ট্রাক এবং ব্যক্তিগত গাড়ির দীর্ঘ সারি প্রায়ই দেখা যেত, যা নিত্যযাত্রীদের জন্য যথেষ্ট অসুবিধার সৃষ্টি করত ।
বর্ষার মরশুমে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠত। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বর্ষাকালে ভূমিধস, সড়ক মেরামতির কাজ এবং ভারী যানজট এই পাহাড়ি রুটে যাতায়াত ব্যাহত করত। গত এপ্রিল মাসে জাতিঙ্গা ও হারাঙ্গাজাওয়ের মধ্যবর্তী ডালাইছুং এলাকায় প্রবল বৃষ্টিপাতের ফলে ভূমিধস দেখা দিয়ে সাময়িকভাবে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এমনকি ২০২৫ সালের জুন মাসে জাতিঙ্গা-হারাঙ্গাজাও অংশে বৃষ্টির পানিতে সড়কের একাংশ ভেসে যাওয়ায় টানা পাঁচ দিন এই গুরুত্বপূর্ণ রুটে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, যার ফলে আগরতলা, মিজোরাম, শিলচর ও হাফলংগামী হাজার হাজার ট্রাক আটকে পড়েছিল ।
শিলচর-সৌরাষ্ট্র করিডোরের বিশাল পরিকল্পনা
শিলচর-সৌরাষ্ট্র ইস্ট-ওয়েস্ট করিডোর মোট ৩,৫৭৬.৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি জাতীয় মহাসড়ক প্রকল্প, যার মধ্যে ৩,৪৮০.৬২ কিলোমিটার নির্মাণকাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহন মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, বাকি ৯৫.৯৩ কিলোমিটার এখনও বাস্তবায়ন বা দরপত্র পর্যায়ে রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ ও অসমে জমি অধিগ্রহণে বিলম্ব, বন ও পরিবেশগত ছাড়পত্র পেতে দেরি, ঠিকাদারদের আর্থিক সমস্যা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে করিডোরের বাকি অংশ সম্পন্ন করতে বিলম্ব হচ্ছে বলে সংসদে জানানো হয়েছিল। বর্তমানে এই করিডোরের সংশোধিত সম্পূর্ণ সমাপ্তির লক্ষ্যমাত্রা ২০২৭ সালের জুন ।
২০০৪ সালে তৎকালীন কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহন মন্ত্রী বি সি খানডুরি ও অর্থমন্ত্রী জসবন্ত সিং শিলচরে এই করিডোরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন, এবং তখন ২০০৭ সালের মধ্যে এটি সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। দুই দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ডিমা হাসাওয়ের পাহাড়ি অংশ এখনও এই বিশাল প্রকল্পের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে রয়েছে বলে টাইমস অফ ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে ।
নর্থ কাছাড় হিলস স্বায়ত্তশাসিত পরিষদের দাবি
সম্প্রতি নর্থ কাছাড় হিলস স্বায়ত্তশাসিত পরিষদ (এনসিএইচএসি) জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষকে ডিমা হাসাও অংশের কাজ দ্রুততর করার আহ্বান জানিয়েছিল। হাফলংয়ে অনুষ্ঠিত একটি পর্যালোচনা বৈঠকে পরিষদের প্রতিনিধিরা মহাসড়কের বর্তমান অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং বরাক উপত্যকা ও ডিমা হাসাওয়ের মধ্যে নিরাপদ, নিরবচ্ছিন্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের দাবি জানান ।
২০২৪ সালের মার্চে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা জানিয়েছিলেন যে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগেই এই করিডোর সম্পন্ন হবে। পরবর্তীতে রাজ্য সরকার জাতিঙ্গা-হারাঙ্গাজাও অংশ জানুয়ারি ২০২৬-এর মধ্যে খোলার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে, যদিও জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল যে সম্পূর্ণ চার-লেন সম্পন্ন হতে এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে । ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, গৌহাটি হাইকোর্টে জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল যে শিলচর-হারাঙ্গাজাও-হাফলং অংশে ৮০ শতাংশের বেশি কাজ সম্পন্ন হয়েছে ।
বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দির জন্য গুরুত্ব
ডলাইছংগা এলিভেটেড করিডোরের এই আংশিক উদ্বোধন বরাক উপত্যকা, বিশেষ করে হাইলাকান্দি জেলা ও লালা টাউনের বাসিন্দাদের জন্য একটি ইতিবাচক সংকেত। হাফলং-শিলচর রুট বরাক উপত্যকার মানুষের জন্য অসমের অন্যান্য অংশ ও উত্তর-পূর্বের বাকি রাজ্যগুলোর সঙ্গে সংযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথ। এই রুটে যানজট কমে গেলে হাইলাকান্দি থেকে গুয়াহাটি বা অন্যান্য গন্তব্যে যাতায়াতকারী যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহনের সময় সাশ্রয় হবে।
তবে টাইমস অফ ইন্ডিয়ার একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, বরাক উপত্যকার প্রতিশ্রুত একাধিক অবকাঠামো প্রকল্প ২০২৫ সালের নির্ধারিত সময়সীমা মিস করেছে, যার মধ্যে ইস্ট-ওয়েস্ট করিডোরের ডিমা হাসাও অংশ এবং শিলংয়ের কাছে মলিংখুং থেকে শিলচরের কাছে পাঞ্চগ্রাম পর্যন্ত ১৬৬.৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ গ্রিনফিল্ড হাই-স্পিড করিডোর (এনএইচ-৬) অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যার প্রাক্কলিত ব্যয় ২২,৮৬৪ কোটি টাকা । এই প্রেক্ষাপটে ডলাইছংগার আগাম উদ্বোধন বরাক উপত্যকার বাসিন্দাদের জন্য একটি স্বস্তিদায়ক ব্যতিক্রম।
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিক্রিয়া ও অবশিষ্ট কাজ
দুটি লেনের এই আগাম উদ্বোধন স্থানীয় বাসিন্দা ও নিয়মিত যাত্রীদের জন্য স্বস্তি বয়ে এনেছে। তবে মহাসড়কের একাধিক অংশ এখনও নির্মাণ ও উন্নয়নের পর্যায়ে রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষকে বাকি কাজগুলো দ্রুত সম্পন্ন করার এবং বিশেষত চলমান বর্ষা মরশুমে নিরবচ্ছিন্ন যান চলাচল নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন ।
যাত্রী ও বাসিন্দারা আশা করছেন যে ডলাইছংগা এলিভেটেড করিডোরের সম্পূর্ণ চালুকরণ হাফলং-শিলচর মহাসড়কে সংযোগ আরও উন্নত করবে এবং যানজট আরও কমাবে। এই এলিভেটেড অংশ পুরোপুরি চালু হলে পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে সৃষ্ট ভূমিধস ও রক্ষণাবেক্ষণ সমস্যা অনেকাংশে এড়ানো সম্ভব হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
আগামী দিনের প্রত্যাশা
আগামী ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ডলাইছংগা করিডোরের বাকি দুটি লেন চালু হলে সম্পূর্ণ চার-লেন সংযোগ বাস্তবায়িত হবে, যা হাফলং-শিলচর রুটের এই ঝুঁকিপূর্ণ অংশে যান চলাচল আরও মসৃণ করে তুলবে। তবে সমগ্র শিলচর-সৌরাষ্ট্র করিডোরের সম্পূর্ণ সমাপ্তি এখনও ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত সময়সাপেক্ষ, যা প্রমাণ করে যে বরাক উপত্যকা ও ডিমা হাসাওয়ের মধ্যে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও আধুনিক সংযোগ প্রতিষ্ঠায় এখনও কিছুটা সময় লাগবে।
ততদিন পর্যন্ত ডলাইছংগার মতো আংশিক সাফল্য বরাক উপত্যকার বাসিন্দাদের জন্য আশার আলো হয়ে থাকবে। নর্থ কাছাড় হিলস স্বায়ত্তশাসিত পরিষদ ও স্থানীয় জনগণের অব্যাহত চাপ যদি জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষকে বাকি কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে উদ্বুদ্ধ করে, তাহলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই বরাক উপত্যকা ও অসমের বাকি অংশের মধ্যে সড়ক সংযোগ একটি নতুন মাত্রা পেতে পারে।