দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলনের মুখে থাকা ডায়ালিসিস রোগীদের জন্য স্বস্তির খবর নিয়ে এল অসম সরকার। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ৩০ জুন এক্স (X) মাধ্যমে ঘোষণা করেন যে, PMJAY (প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা) এবং MMJAY (মুখ্যমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা)-এর আওতায় তালিকাভুক্ত বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে বিনামূল্যে ডায়ালিসিস সেবা আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। এই ঘোষণায় কিছুটা হলেও স্বস্তি পেয়েছেন সেই হাজার হাজার কিডনি রোগী, যাঁরা প্রতি সপ্তাহে একাধিকবার ডায়ালিসিস ছাড়া বাঁচতে পারেন না।
কীভাবে তৈরি হয়েছিল এই সংকট
এই ঘোষণার পটভূমি বুঝতে হলে একটু পিছনে ফিরতে হবে। জুন মাসের শুরুতে রাজ্য সরকার একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানায় যে, ১ জুলাই ২০২৬ থেকে PMJAY ও MMJAY প্রকল্পে বেসরকারি হাসপাতালে ডায়ালিসিস সংক্রান্ত বেশ কিছু চিকিৎসা প্যাকেজ বাতিল করা হচ্ছে। এই তালিকায় ছিল ক্রনিক হেমোডায়ালিসিস, অ্যাকিউট হেমোডায়ালিসিস, পার্মানেন্ট টানেলড ক্যাথেটার স্থাপন এবং পেরিটোনিয়াল ডায়ালিসিস — অর্থাৎ কিডনি বিকল রোগীর জন্য সবচেয়ে জরুরি প্রায় সব ধরনের চিকিৎসাই এই তালিকায় ছিল।
ওই সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ডিব্রুগড়ে শত শত রোগী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা অসম মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে (AMCH) যাওয়ার রাস্তা অবরোধ করে প্রতিবাদ করেন। প্রতিবাদকারীরা জানান, AMCH-তে মাত্র ১২টি ডায়ালিসিস মেশিন থাকায় সরকারি হাসপাতাল একা এই বিশাল চাপ সামলাতে পারবে না। এই পরিস্থিতি অনেক দরিদ্র কিডনি রোগীর জীবন সংকটে ফেলতে পারত বলে চিকিৎসক মহলও উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল।
বেসরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ডায়ালিসিস কারা পাবেন
মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, PMJAY ও MMJAY-এর যোগ্য সুবিধাভোগীরা এই প্রকল্পের আওতায় তালিকাভুক্ত বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে বিনামূল্যে ডায়ালিসিস সেবা পাবেন। একই সঙ্গে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, সরকারি হাসপাতালে চলমান ডায়ালিসিস সেবায় কোনো পরিবর্তন হবে না। অর্থাৎ দুই ধরনের হাসপাতালেই সেবা অব্যাহত থাকবে।
অসম সরকারের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, PMJAY ও MMJAY-এর আওতায় অসমে প্রায় ৫৬ লক্ষ পরিবার সুবিধা পাওয়ার যোগ্য — যার মধ্যে প্রায় ৩০ লক্ষ পরিবার AB-PMJAY এবং বাকি ২৬ লক্ষ পরিবার AA-MMJAY-এর অন্তর্ভুক্ত। এই দুটি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতি পরিবার বছরে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনামূল্যে চিকিৎসা পেতে পারেন এবং রাজ্যে ৩০০-রও বেশি হাসপাতাল এই প্রকল্পে তালিকাভুক্ত।
হাইলাকান্দি ও বরাক উপত্যকায় এই সিদ্ধান্তের প্রভাব
হাইলাকান্দি, কাছাড় ও শ্রীভূমি — বরাক উপত্যকার এই তিনটি জেলায় সরকারি ডায়ালিসিস সুবিধা অত্যন্ত সীমিত। লালা টাউন এবং তার আশেপাশের বাসিন্দারা যখন গুরুতর কিডনি রোগে আক্রান্ত হন, তখন তাদের সাধারণত শিলচর বা গুয়াহাটিতে যেতে হয়। দূরত্ব ও যাতায়াত খরচ মিলিয়ে এই চিকিৎসা দরিদ্র পরিবারের জন্য অসাধারণ চাপ তৈরি করে। এই প্রেক্ষাপটে PMJAY ও MMJAY-এর আওতায় বেসরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ডায়ালিসিস বজায় রাখার সিদ্ধান্তটি বরাক উপত্যকার দরিদ্র রোগীদের জন্য সত্যিকারের জীবনরক্ষী পদক্ষেপ।
অসম আরোগ্য নিধি প্রকল্পের অধীনে যেসব রোগী PMJAY/MMJAY-এর নির্ধারিত সীমা পেরিয়ে যান, তাঁরা আরও ৩ লক্ষ টাকা পর্যন্ত সহায়তা পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন — তবে এর জন্য পরিবারের বার্ষিক আয় ৫ লক্ষ টাকার কম হতে হবে। হাইলাকান্দি বা লালা টাউনের কোনো রোগী যদি এই সহায়তা নিতে চান, তাহলে NHM অসমের ওয়েবসাইট থেকে আবেদনপত্র ডাউনলোড করে গুয়াহাটিতে মিশন ডিরেক্টরের অফিসে জমা দিতে হবে।
সেপ্টেম্বরের পরে কী হবে — প্রশ্ন থাকছেই
৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিনামূল্যে ডায়ালিসিস সেবার মেয়াদ বাড়ানো অবশ্যই স্বস্তির, তবে রোগী ও তাঁদের পরিবারের মনে একটি প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে — অক্টোবরের পরে কী হবে? ডায়ালিসিস কোনো এককালীন চিকিৎসা নয়; কিডনি বিকল রোগীকে সারাজীবন এই চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হয়। প্রতিটি সেশনের খরচ বেসরকারি হাসপাতালে ১,২৫০ টাকা বা তার বেশি, এবং একজন রোগীকে প্রতি সপ্তাহে দুই থেকে তিনটি সেশন নিতে হয়। সরকারি প্রকল্পের আওতা না থাকলে মাসে প্রায় ১০,০০০ থেকে ১৫,০০০ টাকা শুধু ডায়ালিসিসেই খরচ হয়, যা গরিব পরিবারের পক্ষে বহন করা কার্যত অসম্ভব।
রাজ্য সরকারের উচিত এই তিন মাসের মধ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদী ও স্থায়ী নীতি নির্ধারণ করা। সরকারি হাসপাতালে ডায়ালিসিস মেশিনের সংখ্যা এবং প্রশিক্ষিত কর্মীর সংখ্যা যথেষ্ট না বাড়লে শুধুমাত্র সরকারি ব্যবস্থার উপর নির্ভর করা সম্ভব হবে না। চিকিৎসক মহল ও রোগী সংগঠনগুলো আশা করছে, এই সময়ের মধ্যে সরকার একটি সামগ্রিক কিডনি স্বাস্থ্যসেবা নীতি তৈরি করবে, যেখানে বেসরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ডায়ালিসিস সেবা স্থায়ীভাবে অন্তর্ভুক্ত থাকবে।