আসামে বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৪১, কারণ গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ১০ জনের প্রাণহানি হয়েছে। আসাম রাজ্য বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (এএসডিএমএ)-এর সর্বশেষ দৈনিক বুলেটিন অনুযায়ী, মঙ্গলবার মধ্যরাত থেকে বুধবার সকালের মধ্যে এই ১০ জনের মৃত্যু হয়, যাদের মধ্যে চারজন শিশু। বন্যা পরিস্থিতি এখনও রাজ্যের ১১টি জেলায় গুরুতর, যেখানে প্রায় ৬ লক্ষ ৫৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
সর্বশেষ পরিস্থিতি ও ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান
এএসডিএমএ-র রিপোর্ট অনুসারে, গত ২৪ ঘণ্টায় যে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে, তার মধ্যে শিবসাগর ও যোরহাট জেলায় তিনজন করে, চরাইদেও জেলায় দুজন এবং ধেমাজি ও কার্বি আংলং জেলায় একজন করে মৃত্যু হয়েছে। এর ফলে এ বছরের বন্যায় মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪১-এ। এর আগের রিপোর্টে জানা গিয়েছিল, মোট মৃতের মধ্যে ২৫ জনই ছিলেন শিবসাগর, চরাইদেও ও যোরহাট জেলার বাসিন্দা, যা এই তিন জেলাকে বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
বর্তমানে যে ১১টি জেলা বন্যা কবলিত, সেগুলি হলো শিবসাগর, চরাইদেও, ধেমাজি, ডিব্রুগড়, গোলাঘাট, হোজাই, যোরহাট, কামরূপ, কামরূপ মেট্রোপলিটন, কার্বি আংলং ও নগাঁও। এএসডিএমএ-র তথ্য অনুযায়ী, বন্যার জলে ৯৩৯টি গ্রাম সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে জলমগ্ন হয়েছে এবং প্রায় ২৪,৮৯৭.২৭ হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাজ্য প্রশাসন এই মুহূর্তে ১০টি জেলায় মোট ৪৮৭টি ত্রাণ শিবির ও বিতরণ কেন্দ্র পরিচালনা করছে, যেখানে ২৪,৪১৮ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।
দ্রুত বাড়ছে বন্যার তীব্রতা
আসামে বন্যায় মৃতের সংখ্যা এই মাসে বিস্ময়করভাবে দ্রুত বেড়েছে। ২০ জুলাই পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ছিল মাত্র ১১, যখন ১১টি জেলায় প্রায় ৩.১০ লক্ষ মানুষ প্রভাবিত হয়েছিলেন। তারপর ২১ জুলাইয়ের মধ্যে টোল বেড়ে হয় ৩১, এবং প্রভাবিত মানুষের সংখ্যা পৌঁছে যায় ৫.৬৪ লক্ষে ১৬টি জেলায়। অর্থাৎ মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে মৃতের সংখ্যা প্রায় চারগুণ বেড়েছে, যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতির স্পষ্ট প্রমাণ l
আসামের একজন মন্ত্রী পূর্ব আসামের এই বন্যাকে গত ৬০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বলে বর্ণনা করেছেন। আবহাওয়া দপ্তর ইতিমধ্যে বুধবার রাজ্যের জন্য ‘অরেঞ্জ অ্যালার্ট’ জারি করেছে এবং আগামী চার দিনের জন্য ‘ইয়েলো অ্যালার্ট’ জারি রেখেছে, কারণ বজ্রঝড়, বজ্রপাত ও বিচ্ছিন্নভাবে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ব্রহ্মপুত্র ও তার শাখা নদীগুলির জলস্তর এখনও বিপদসীমার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম।
বরাক উপত্যকার পরিস্থিতি কেমন
বর্তমান বন্যার এই সাম্প্রতিক তরঙ্গে কাছাড়, হাইলাকান্দি বা শ্রীভূমির (করিমগঞ্জ) নাম এএসডিএমএ-র হালনাগাদ তালিকায় নেই, অর্থাৎ এই মুহূর্তে বরাক উপত্যকা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ রয়েছে। তবে এর আগে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে কাছাড় জেলা ১২টি প্রভাবিত জেলার তালিকায় ছিল, যখন রাজ্যজুড়ে প্রায় ১.৭ লক্ষ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন। বরাক উপত্যকার ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়, এই অঞ্চল প্রতি বর্ষায় বারবার বন্যার কবলে পড়ে, বিশেষত বরাক, ধলেশ্বরী, কাটাখাল ও লঙাই নদীর জলস্তর বাড়লে।
গত বছরের জুন মাসে হাইলাকান্দিতে ধলেশ্বরী ও কাটাখাল নদীর বাঁধ ভেঙে একাধিক এলাকা জলমগ্ন হয়েছিল, এবং নিজবরনারপুরে বিশু রায় নামের এক ব্যক্তি বন্যার জলে ডুবে মারা যান। এই ধরনের পুনরাবৃত্ত ঘটনা দেখিয়ে দেয়, বরাক উপত্যকার জেলাগুলি—বিশেষত হাইলাকান্দি ও লালা টাউনের আশপাশের নিচু এলাকা—বন্যার ঝুঁকি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত নয়, এবং বর্ষার বাকি সময়েও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
সামনে কী দেখার
আসামে বন্যায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা, কারণ আগামী কয়েকদিন রাজ্যের একাধিক অংশে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস বহাল রয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার ইতিমধ্যে রাজ্যকে সম্পূর্ণ সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে, এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান বন্যা কবলিত এলাকা পরিদর্শন করে ত্রাণ ও পুনর্বাসন কাজ পর্যালোচনা করেছেন। তবে পরিস্থিতি এখনও অস্থিতিশীল, এবং এএসডিএমএ প্রতিদিন হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করছে।
বরাক উপত্যকার বাসিন্দাদের জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নদীর জলস্তর ও আবহাওয়া দপ্তরের সতর্কবার্তার ওপর নিয়মিত নজর রাখা। উজান আসামের এই ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দেয় যে, রাজ্যের বিভিন্ন অংশে একযোগে দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি কতটা জরুরি—আর হাইলাকান্দি, লালা টাউন-সহ বরাক উপত্যকার প্রশাসনকেও এই শিক্ষা মাথায় রেখে আগাম সতর্কতা বজায় রাখতে হবে।