দেশজুড়ে আজ, শুক্রবার (২৮ আগস্ট) মহাসমারোহে পালিত হচ্ছে রক্ষাবন্ধন উৎসব। ভাই-বোনের অটুট প্রেম ও বিশ্বাসের প্রতীক এই পবিত্র উৎসবে বোনেরা ভাইয়ের কব্জিতে রঙিন রাখি বেঁধে তাঁদের সুখ, সমৃদ্ধি ও দীর্ঘায়ু কামনা করছেন, আর ভাইয়েরা প্রতিদানে বোনদের রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে উপহার প্রদান করছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী শুক্রবার সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে দেশবাসীকে রক্ষাবন্ধনের আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়েছেন ।
শুভ মুহূর্ত ও তিথির বিশেষ তথ্য
এই বছর রক্ষাবন্ধন উৎসবে একটি বিশেষ শুভ সংযোগ তৈরি হয়েছে, কারণ এই দিনে কোনো ভদ্রা কালের প্রভাব নেই। হিন্দু পঞ্জিকা অনুসারে শ্রাবণ পূর্ণিমা তিথি শুরু হয়েছিল ২৭ আগস্ট সকাল ৯টা ৮ মিনিটে এবং তা শেষ হচ্ছে ২৮ আগস্ট সকাল ৯টা ৪৮ মিনিটে। জ্যোতিষশাস্ত্র অনুযায়ী রাখি বাঁধার সবচেয়ে শুভ সময় সকাল ৫টা ৫৭ মিনিট থেকে সকাল ৯টা ৪৮ মিনিট পর্যন্ত—প্রায় তিন ঘণ্টা ৫১ মিনিটের একটি উইন্ডো, যা লাইভমিন্ট-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে ।
ভদ্রা কালের অনুপস্থিতির কারণে এই বছর বোনেরা সারাদিন ধরে যে কোনো সময়ে রাখি বাঁধতে পারবেন বলে জ্যোতিষীরা জানিয়েছেন। উল্লেখযোগ্যভাবে, রক্ষাবন্ধনের দিনে একটি চন্দ্রগ্রহণও রয়েছে, তবে এটি ভারতে দৃশ্যমান হবে না, ফলে এর সূতক কালও প্রযোজ্য হবে না এবং উৎসব উদযাপনে কোনো প্রভাব পড়বে না বলে জ্যোতিষশাস্ত্র সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে ।
প্রধানমন্ত্রী ও শীর্ষ নেতাদের শুভেচ্ছা বার্তা
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর শুভেচ্ছা বার্তায় বলেছেন, “রক্ষাবন্ধন উপলক্ষে আন্তরিক শুভেচ্ছা। এই পবিত্র উৎসব আপনাদের সকলের জীবনে সুখ, সমৃদ্ধি ও সাফল্য নিয়ে আসুক। প্রেম, স্নেহ এবং পারস্পরিক বিশ্বাসের বন্ধন চিরকাল অটুট থাকুক—এটাই আমার আন্তরিক কামনা” । কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুও এই উপলক্ষে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
বিজেপির জাতীয় সভাপতি নিতিন নবীন এই উৎসব প্রসঙ্গে বলেছেন যে, এই উৎসব সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ও পারিবারিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে তোলে । এছাড়াও একাধিক রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীও নিজ নিজ সামাজিক মাধ্যম মাধ্যমে এই উৎসব উপলক্ষে বিশেষ বার্তা প্রকাশ করেছেন, যা এই উৎসবের জাতীয় গুরুত্বকেই প্রতিফলিত করে।
রক্ষাবন্ধনের ঐতিহাসিক ও সামাজিক তাৎপর্য
রক্ষাবন্ধন প্রতি বছর হিন্দু পঞ্জিকার শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে উদযাপিত হয়, যা সাধারণত জুলাই বা আগস্ট মাসে পড়ে। এই উৎসব মূলত ভারত ও নেপালে পালিত হয় এবং এটি হিন্দু চন্দ্র-সৌর পঞ্জিকার শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে অনুষ্ঠিত হয় বলে সংবাদ সংস্থা আইএএনএস-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে ।
ঐতিহ্যবাহী রীতি অনুযায়ী, রাখি বাঁধার আগে বোনেরা ভাইয়ের কপালে তিলক লাগান, তারপর রাখি বাঁধেন এবং পরিবারের সদস্যরা একসাথে মিষ্টি ও উপহার বিনিময় করেন। এই উৎসব কেবল রক্তসম্পর্কীয় ভাই-বোনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যেও সম্প্রীতি ও ঐক্যের বার্তা বহন করে।
হাইলাকান্দি ও বরাক উপত্যকায় উৎসবের আমেজ
হাইলাকান্দি জেলা এবং ললা টাউন সহ পুরো বরাক উপত্যকা জুড়ে আজ রক্ষাবন্ধন উৎসব একই উৎসাহ ও আনন্দের সাথে পালিত হচ্ছে। স্থানীয় বাজারগুলোতে গত কয়েকদিন ধরে রাখি ও উপহার সামগ্রী কেনার জন্য ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। বাংলা ও অসমীয়া সংস্কৃতির মিশ্রণে সমৃদ্ধ এই অঞ্চলে রক্ষাবন্ধন একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও পারিবারিক উৎসব হিসেবে বিবেচিত হয়।
স্থানীয় পরিবারগুলোতে সকাল থেকেই রাখি বাঁধার প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। বোনেরা ঐতিহ্যবাহী রীতি অনুসরণ করে ভাইদের কব্জিতে রাখি বাঁধেন এবং পরিবারের সদস্যরা মিলে উৎসব উদযাপন করেন। কর্মসূত্রে বাইরে অবস্থানরত অনেক ভাই-বোন এই উপলক্ষে বাড়িতে ফিরে আসেন অথবা ডিজিটাল মাধ্যমে একে অপরের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন, যা আধুনিক যুগে এই ঐতিহ্যবাহী উৎসবের অভিযোজনের একটি উদাহরণ।
আগামী দিনের প্রেক্ষাপট
রক্ষাবন্ধন উৎসব শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি পারিবারিক বন্ধন এবং সামাজিক সম্প্রীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে প্রতি বছর নতুন উদ্যমে উদযাপিত হয়। এই বছরের বিশেষত্ব হলো ভদ্রা কালের অনুপস্থিতি, যা বোনদের জন্য দিনভর রাখি বাঁধার সুবিধা প্রদান করেছে।
আগামী বছরগুলোতেও এই উৎসব একইভাবে দেশ ও বরাক উপত্যকার মানুষের মধ্যে পারিবারিক সংহতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বজায় রাখার একটি মাধ্যম হয়ে থাকবে। হাইলাকান্দি ও ললা টাউনের বাসিন্দাদের জন্য এই উৎসব প্রতি বছরের মতোই পরিবারের সাথে একত্রিত হওয়া এবং ঐতিহ্যবাহী মূল্যবোধ ধারণ করার একটি বিশেষ সুযোগ নিয়ে আসে।