দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ডিমা হাসাও জেলার নিউ হারাঙ্গাজাও স্টেশনের লাইন-২ ও লাইন-৩ সম্পূর্ণভাবে পুনরুদ্ধার করেছে উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলওয়ে (NFR)। ইন্ডিয়া টুডে এনই-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, রেললাইনের ধসে যাওয়া অংশ স্থিতিশীল হওয়ার পর এই দুটি লাইন দিয়ে ধীরে ধীরে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হচ্ছে। তবে একই দিনে, ৪ সেপ্টেম্বর ভারী বৃষ্টির কারণে হাইলাকান্দি সংলগ্ন কাটাখাল-বৈরাবি রেলপথে নতুন করে মাটি ক্ষয়ের ঘটনা ঘটায় বরাক উপত্যকার রেল যোগাযোগে ফের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে ।
নিউ হারাঙ্গাজাও লাইন পুনরুদ্ধারের বিস্তারিত অগ্রগতি
NFR বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর নিশ্চিত করেছে যে রেললাইনের স্থিতিশীলতা অর্জনের পর লাইন-২ ও লাইন-৩ দিয়ে ট্রেন পরিচালনার কাজ ক্রমান্বয়ে স্বাভাবিক করা হচ্ছে, এবং এই দুটি লাইনের মাধ্যমে ট্রেনের মসৃণ চলাচল নিশ্চিত করতে উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা অব্যাহত রাখা হয়েছে। নিউ হারাঙ্গাজাওয়ের কাছে লাইন-১-এর পুনরুদ্ধার কাজও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চলমান রয়েছে বলে জানানো হয়েছে ।
এই পুনরুদ্ধার কাজে প্রায় ৫০০ জন কর্মী এবং ভারী যন্ত্রপাতি মোতায়েন করা হয়েছিল অস্থিতিশীল অংশ স্থিতিশীল করার জন্য। লাইন-১ সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে সম্পূর্ণভাবে পুনরুদ্ধার হবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা লামডিং-বদরপুর পাহাড়ি সেকশনে ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণভাবে স্বাভাবিক করে তুলবে ।
গুয়াহাটি-শিলচর এক্সপ্রেসসহ একাধিক ট্রেনের সময়সূচি পরিবর্তন
পুনরুদ্ধার কাজ চলাকালীন ৪ সেপ্টেম্বর যাত্রা শুরু করার কথা থাকা ট্রেন নং ১৫৬১৫ (গুয়াহাটি-শিলচর) এক্সপ্রেস সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা হয়েছে। এছাড়াও ট্রেন নং ১৫৬৫০ (নারাঙ্গি-আগরতলা) এক্সপ্রেস নারাঙ্গি থেকে সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে এবং ট্রেন নং ২০৫০৭ (সাইরাং-আনন্দ বিহার টার্মিনাল) এক্সপ্রেস সাইরাং থেকে রাত ৮টা ১০ মিনিটে নির্ধারিত সময়ের পরিবর্তে ছাড়বে বলে ইন্ডিয়া টুডে এনই জানিয়েছে ।
NFR স্পষ্ট করেছে যে এই পরিবর্তনগুলো নিরাপদ, মসৃণ এবং কার্যকর ট্রেন পরিচালনা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই করা হয়েছে, যখন সেকশনে পুনরুদ্ধার কাজ চলমান রয়েছে । এই ধারাবাহিক পরিবর্তনের ফলে যাত্রীদের প্রতিদিন সংশোধিত সময়সূচি যাচাই করে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে।
হাইলাকান্দিতে নতুন রেল বিপর্যয়ের সূত্রপাত
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, নিউ হারাঙ্গাজাওয়ের সমস্যা সমাধানের মধ্যেই হাইলাকান্দি সংলগ্ন এলাকায় একটি নতুন রেল বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। এশিয়ানেট নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারী বৃষ্টির কারণে অসম-মিজোরাম সংযোগকারী কাটাখাল-বৈরাবি রেলপথের জামিরা ও বৈরাবির মধ্যবর্তী প্রায় ৫০ মিটার দীর্ঘ একটি অংশে মাটি ক্ষয়ের ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে এই সেকশনে ট্রেন পরিষেবা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে ।
উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলওয়ের মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিক কপিঞ্জল কিশোর শর্মা জানিয়েছেন, “ট্র্যাকটি আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত সেকশনে ট্রেন পরিষেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে।” তিনি আরও জানান যে, ৩ সেপ্টেম্বরের ট্রেন নং ১৫৬১০ (সাইরাং-গুয়াহাটি) এক্সপ্রেস বৈরাবিতে সংক্ষিপ্তভাবে সমাপ্ত করে সাইরাংয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে, এবং ট্রেন নং ৫৫৬৬৭ (শিলচর-বৈরাবি) প্যাসেঞ্জার ট্রেন জামিরাতে সংক্ষিপ্তভাবে সমাপ্ত হয়েছে ।
হাইলাকান্দি স্টেশন পর্যন্ত ট্রেন পরিষেবা বাতিলের প্রভাব
উল্লেখযোগ্যভাবে, এই বিপর্যয়ের সরাসরি প্রভাব পড়েছে হাইলাকান্দি স্টেশনে চলাচলকারী ট্রেনগুলোর উপর। শর্মা জানিয়েছেন যে, ট্রেন নং ১৫৬০৯ (গুয়াহাটি-সাইরাং) হাইলাকান্দিতে সংক্ষিপ্তভাবে সমাপ্ত হয়েছে এবং হাইলাকান্দি থেকে সাইরাং পর্যন্ত অংশে বাতিল থাকবে। এছাড়াও ট্রেন নং ৫৫৬৬৮ (বৈরাবি-শিলচর), ট্রেন নং ১৩১২৬ (সাইরাং-কলকাতা) এবং ট্রেন নং ৫৫৬৬৯ (শিলচর-সাইরাং), যেগুলো ৪ সেপ্টেম্বর যাত্রা শুরু করার কথা ছিল, সেগুলোও বাতিল থাকবে বলে জানানো হয়েছে ।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় তাৎক্ষণিকভাবে কর্মী ও সরঞ্জাম মোতায়েন করেছে মেরামত ও পুনরুদ্ধার কাজের জন্য। যাত্রীদের সুবিধার্থে বিকল্প সড়ক পরিবহনের ব্যবস্থাও করা হয়েছে, বিশেষত বৈরাবির দিকে ভ্রমণকারী যাত্রীদের জন্য বলে ইন্ডিয়া টুডে এনই-এর একটি পৃথক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে ।
হাইলাকান্দি ও বরাক উপত্যকার যাত্রীদের জন্য দ্বিমুখী প্রভাব
হাইলাকান্দি জেলা এবং ললা টাউনের বাসিন্দাদের জন্য এই পরিস্থিতি একটি জটিল দ্বিমুখী চিত্র তুলে ধরছে। একদিকে নিউ হারাঙ্গাজাওয়ের পুনরুদ্ধারের ফলে গুয়াহাটির সাথে যোগাযোগ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার আশা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে হাইলাকান্দি সংলগ্ন কাটাখাল-বৈরাবি সেকশনে নতুন বিপর্যয় স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য মিজোরামের সাথে সংযোগেও বাধা সৃষ্টি করছে।
স্থানীয় যাত্রীদের জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ হলো, যেকোনো যাত্রা পরিকল্পনার আগে NFR-এর সর্বশেষ আপডেট যাচাই করে নেওয়া। যেহেতু একই সময়ে দুটি ভিন্ন সেকশনে সমস্যা চলছে, তাই সময়সূচিতে ঘন ঘন পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আগামী দিনের প্রত্যাশা ও পর্যবেক্ষণ
রেলওয়ে কর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছেন এবং কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানানো হয়েছে। নিউ হারাঙ্গাজাওয়ের লাইন-১ সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে পুনরুদ্ধার হলে এবং কাটাখাল-বৈরাবি সেকশনের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দ্রুত মেরামত হলে, বরাক উপত্যকা ও মিজোরামের সাথে রেল সংযোগ সম্পূর্ণভাবে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে পারে।
আগামী কয়েক দিনের মধ্যে NFR-এর পক্ষ থেকে উভয় সেকশনের পুনরুদ্ধার অগ্রগতি সম্পর্কে আরও তথ্য প্রকাশিত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। ততদিন পর্যন্ত হাইলাকান্দি ও বরাক উপত্যকার যাত্রীদের ধৈর্য ধরে রেলওয়ের নিয়মিত ঘোষণার দিকে নজর রাখতে হবে এবং প্রয়োজনে বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থার কথাও বিবেচনা করতে হবে।