Read today's news --> ⚡️Click here 

আসাম বাল্যবিবাহ বিরোধী অভিযান পেল ইউএন স্বীকৃতি

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ২৭ নভেম্বরকে ‘শিশু, প্রাথমিক ও জোরপূর্বক বিবাহ অবসানের আন্তর্জাতিক দিবস’ হিসেবে ঘোষণার পর আসামের মুখ্যমন্ত্রী ডঃ হিমন্ত বিশ্ব শর্মা শনিবার বলেছেন যে এই স্বীকৃতি রাজ্যের দীর্ঘমেয়াদি বাল্যবিবাহ বিরোধী অভিযানকে আরও শক্তিশালী করবে। গুয়াহাটি থেকে প্রকাশিত এক বার্তায় মুখ্যমন্ত্রী বলেন যে শিশু ও জোরপূর্বক বিবাহের সমাজে “কোনো স্থান নেই” এবং এই ধরনের কাজে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান ।

আসাম বাল্যবিবাহ বিরোধী অভিযানের পরিসংখ্যান ফলাফল

মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা আসামের গত কয়েক বছরের প্রচেষ্টার ওপর আলোকপাত করে দাবি করেন যে বাল্যবিবাহ বিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে ১২,০০০-এর বেশি মামলা নথিবদ্ধ করা হয়েছে এবং ১১,০০০-এর বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী সঠিক পরিসংখ্যান উল্লেখ করে বলেন যে ২০২১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ১২,১৯৪টি বাল্যবিবাহ সংক্রান্ত মামলা নথিবদ্ধ হয়েছে এবং ১১,০৯৯ জনকে এই মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ।

মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান যে রাজ্যের ২০টি জেলায় বাল্যবিবাহের ঘটনা ৮১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যার ফলে কিশোরী গর্ভাবস্থার হারও কমেছে এবং উচ্চশিক্ষায় নারী ভর্তির হার বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিসংখ্যান আসাম পুলিশের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও তদন্ত ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে রাজ্যের দণ্ডিত হওয়ার হার ২০২১ সালের ৭ শতাংশ থেকে বর্তমানে ২৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে ।

ইউএন ঘোষিত ২৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক দিবসের তাৎপর্য

জাতিসংঘের এই ঘোষণা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০ অর্জনের দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই তারিখটি ভারতের জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করে, কারণ ২০২৪ সালের ২৭ নভেম্বর ভারত সরকার ‘বাল বিবাহ মুক্ত ভারত’ অভিযান শুরু করেছিল । ইউএন-এর এই ঘোষণা লিঙ্গ সমতা সংক্রান্ত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ৫.৩-এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা শিশু, প্রাথমিক ও জোরপূর্বক বিবাহ সহ সকল ক্ষতিকর অনুশীলন অবসানের আহ্বান জানায়।

শিশু অধিকার কর্মী এবং জাস্ট রাইটস ফর চিলড্রেনের প্রতিষ্ঠাতা ভুবন রিভু জাতিসংঘের কাছে পুরো বিশ্ব থেকে বাল্যবিবাহ অবসানের জন্য একটি দিন সমর্পিত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন, যা এই ঘোষণার পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে । জাতিসংঘ ২০৩০ সালের মধ্যে বাল্যবিবাহ অবসানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ।

নভেম্বর মাসজুড়ে আসামে বিশেষ অভিযানের পরিকল্পনা

মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা জানান যে আসাম সরকার ইতিমধ্যে নভেম্বর মাসজুড়ে শিশু ও জোরপূর্বক বিবাহের বিরুদ্ধে “অস্বীকারোক্তিহীন অভিযান” চালানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, যার লক্ষ্য অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা। তিনি বলেন, “আমাদের কন্যাদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা” এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য হয়ে থাকবে । মুখ্যমন্ত্রী এই অভিযানকে একটি বিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা নয়, বরং বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে বৃহত্তর বৈশ্বিক লড়াইয়ের অংশ হিসেবে বর্ণনা করেন।

মুখ্যমন্ত্রী ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবসের ভাষণেও এই ৩০ দিনের বিশেষ অভিযানের ঘোষণা দিয়েছিলেন, যা ১ নভেম্বর থেকে শুরু হবে এবং পুরো আসাম জুড়ে পুলিশ সখতি থেকে কানুনি কার্যকলাপ চালিয়ে যাবে । এই ঘোষণার মাধ্যমে সরকার বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।

নিজুট মৈনা প্রকল্পের মাধ্যমে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের কৌশল

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আসাম সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হলো নিজুট মৈনা প্রকল্প, যা কন্যা শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে তাদের উচ্চশিক্ষা অব্যাহত রাখতে সহায়তা করে। দ্য নিউজমিলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে নিজুট মৈনা প্রকল্পের প্রাথমিক উদ্দেশ্য হলো বাল্যবিবাহ নির্মূল করা, যা সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ।

২০২৪-২৫ সালে ১,৬০,০০০ কন্যা শিক্ষার্থী এই প্রকল্পের সুবিধা পেয়েছিলেন, যা ২০২৫-২৬ সালে ৪,০০,০০০-এ উন্নীত হয়েছে। বর্তমান আর্থিক বছরে আরও ১,০০,০০০ কন্যা শিক্ষার্থী এই সুবিধা পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী ব্যাখ্যা করেন যে আর্থিক সহায়তার স্তরে পার্থক্যের কারণ হলো নিজুট মৈনা প্রকল্পটি প্রাথমিকভাবে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের জন্য চালু করা হয়েছে, যাতে আর্থিক সঙ্কট কন্যাদের প্রাথমিক বিবাহে বাধ্য না করে ।

বরাক উপত্যকা হাইলাকান্দির জন্য এই উদ্যোগের তাৎপর্য

বরাক উপত্যকা, যার মধ্যে হাইলাকান্দি জেলাও অন্তর্ভুক্ত, ঐতিহাসিকভাবে বাল্যবিবাহের হার জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি ছিল বলে ন্যাশন ফ্যামিলি হেলথ সার্ভের তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। নেশন প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আসাম ঐতিহাসিকভাবে এনএফএইচএস সমীক্ষায় বাল্যবিবাহের হার জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি রেকর্ড করেছে । এই প্রেক্ষাপটে, আসাম সরকারের বাল্যবিবাহ বিরোধী অভিযান হাইলাকান্দি জেলার জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

হাইলাকান্দি জেলার গ্রামীণ এলাকাগুলোতে বাল্যবিবাহ একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হয়। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষিত ৩০ দিনের বিশেষ অভিযান এবং নিজুট মৈনা প্রকল্পের মতো উদ্যোগ স্থানীয় পরিবারগুলোকে কন্যা শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা অব্যাহত রাখতে উৎসাহিত করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে বাল্যবিবাহের হার কমাতে সহায়ক হবে।

আগামী দিনের পরিকল্পনা প্রত্যাশা

মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা জাতিসংঘের এই স্বীকৃতি প্রসঙ্গে বলেন, “আসামের বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে লড়াই একটি জাতীয় আখ্যান তৈরি করেছে, এবং এখন এটি বৈশ্বিক স্বীকৃতির ভার বহন করছে।” তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন যে বাল্যবিবাহমুক্ত সমাজ গঠনে তাঁর সরকারের প্রতিশ্রুতি অটুট রয়েছে ।

ভারত সরকার ২০২৬ সালের মধ্যে বাল্যবিবাহের প্রাদুর্ভাব ১০ শতাংশ হ্রাস করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে । আসামের মতো রাজ্যগুলোতে এই ধরনের কঠোর অভিযান এবং আর্থিক সহায়তা প্রকল্পের সমন্বিত প্রচেষ্টা এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। আগামী নভেম্বর মাসের ৩০ দিনের বিশেষ অভিযানের ফলাফল এবং দীর্ঘমেয়াদে বাল্যবিবাহের হার কতটা হ্রাস পায়, তার দিকেই এখন নজর থাকবে রাজ্যবাসীর।

আসাম বাল্যবিবাহ বিরোধী অভিযান পেল ইউএন স্বীকৃতি
Scroll to top